আইএমএফের সঙ্গে দরকষাকষিতে সরকারের ধারাবাহিক মিটিং

মাসুম বিল্লাহ: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে দরকষাকষি শুরু করেছে আইএমএফ। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সভা করছেন আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। মূলত সাম্প্রতিক সময়ে সংকটে পড়া বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির উন্নতি সাধন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ) শক্তিশালী করা ও মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকার এ ঋণ নিতে চায়।

জানা যায়, এক দশক পর ফের আইএমএফের কাছে ঋণ চাইবে বাংলাদেশ। সদস্য হিসেবে আইএমএফ থেকে বাংলাদেশ বছরে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার যোগ্য। তাই প্রতিবছর ১৫০ কোটি ডলার করে তিন বছরে এই ঋণ চাইবে সরকার। এ অর্থ গ্রহণ করা হবে বাজেট সহায়তা হিসেবে। বাজেট সহায়তার অর্থ সরকার নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো ধরনের ব্যয় মেটানোর জন্য ব্যবহার করতে পারে। আইএমএফও এ ঋণ দিতে মোটামুটি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি।

আইএমএফ ঋণদানের ক্ষেত্রে নানা ধরনের শর্ত আরোপ করে থাকে। একটি দেশের অর্থনীতি যাতে খাদের কিনারে চলে না যায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য সংস্থাটি এমন শর্ত আরোপ করে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে বাজেট ঘাটতি হ্রাস করা, খেলাপি ঋণের হার কমানো, ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করা, ডলারের বিনিময়হার কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা, বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি হ্রাসকরণ প্রভৃতি।

মূলত এসব বিষয়ে দরকষাকষির লক্ষ্যে গত ১২ জুলাই ৯ দিনের সফরে আইএমএফের এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে একটি দল ঢাকায় এসে পৌঁছে। এ প্রতিনিধিদলটি আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের দল। দলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, ইআরডি প্রভৃতি সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করছে। এর অংশ হিসেবে গত রোববার সরকারের কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে চারটি সভা করে প্রতিনিধিদল।

এছাড়া গতকালও তিনটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন অর্থ বিভাগের বিভিন্ন উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো সরকারের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা ছাড়াও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব সভায় অংশ নেন। আজ অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি দলের সঙ্গে আইএমএফ মিশনের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া আগামীকাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের সঙ্গে বৈঠক করবে মিশন। পাশাপাশি আগামী বৃহস্পতিবার অর্থ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করবে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। আগামী ২২ জুলাই প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানাত চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম গতকাল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এখনও শক্তিশালী পর্যায়েই রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বর্তমানে ডলারের প্রাপ্যতায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। সাময়িক এ সংকট মোকাবিলার জন্য পূর্বসতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সরকার আইএমএফ থেকে ঋণ নিতে চাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে এবং আইএমএফ’ও এ ঋণ দেয়ার ব্যাপারে মোটামুটি সম্মত।’ ঋণের শর্ত ও ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে তারা স্বাভাবিকভাবে কিছু শর্ত আরোপ করে। তবে সব শর্ত যে সরকার মেনে নেবে ব্যপারটা তেমন নয়। যেমন আইএমএফ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমাতে বলে। এক্ষেত্রে কৃষিতে সরকার ভর্তুকি কমাবে না। আর ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া ও ছাড়করণ প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে দরকষাকষি চলছে। এখনও এসব বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। চলমান বৈঠকগুলোর পর এসব বিষয় চূড়ান্ত হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঋণের শর্তের ব্যাপারে বৈঠক করতে এরপর আরেকটি দল আসবে। সেই দলের নেতৃত্ব দেবেন আইএমএফের ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার নির্বাহী পরিচালক সুরজিৎ ভালা। দরকষাকষি চূড়ান্ত হলে ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি ওয়াশিংটনে আইএমএফের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ এর আগে আইএমএফ থেকে চারবার ঋণ নেয়। প্রথমবার ঋণ নেয়া হয় ১৯৯০-৯১ সময়ে। এরপর ২০০৩-২০০৪, ২০১১-১২ এবং সর্বশেষ ২০২০-২১ সালে সংস্থাটি থেকে ঋণ নেয় বাংলাদেশ। তবে কোনোবারই ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার ছাড়ায়নি।