প্রতিনিধি, যশোর: অতিরিক্ত লাভের আশায় আগাম জাতের শিম চাষ করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন যশোরের চাষিরা। বিরূপ আবহাওয়া শিমের ফলন বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। অন্যান্য বছর এ সময় যশোরের বাজারগুলোয় স্থানীয় চাষিদের ক্ষেতের শিমে সয়লাব হয়ে গেলেও এবার তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। এক বিঘা জমিতে ৫-৬ কেজিও শিম ফলাতে পারছেন না চাষিরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, শিম চাষের উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টি না হওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি হয়েছে। চলমান বৃষ্টি থেমে গেলে গাছে নতুন করে ফুল ও ফল আসতে পারে বলে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা আশা করছেন।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি বছর যশোরের বিভিন্ন এলাকায় এক হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের শিম চাষ হয়েছে। যশোরের বারীনগর, মানিকদিহি, হৈবতপুর, খাজুরা, তীরের হাট, চুড়ামনকাঠি, শাহবাজপুর ও চৌগাছা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে মাঠের পর মাঠ শিমের ফুলে ভরে গেছে। পুরো মাঠজুড়ে সবুজ আর বেগুনি রঙের বাহার। তবে এ বছর অসময়ে বৃষ্টিপাত ও তীব্র তাপমাত্রার কারণে শিমের মারাত্মক ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
চাষিরা জানান, অন্যান্য বছর এ সময়ে তারা প্রতিবিঘা জমি থেকে সপ্তাহে ৫ থেকে ৬ মণ শিম তুলে বাজারে নিতে পারলেও এবার তা সম্ভব হচ্ছে না। বিরূপ আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণে ফলন বিপর্যয়ের কারণে তারা বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লোকসান গুনছেন।
সদর উপজেলার তীরেরহাট এলাকার মাঠে কথা হয় শিমচাষি রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, এ বছর শিম চাষ করে তারা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একদিকে অনাবৃষ্টি, তারপর অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে গাছে ফুল দাঁড়াতে পারেনি। যে কারণে কোনো গাছে শিম ধরেনি। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে শিম চাষ করেছেন। এক মাস আগে প্রতিটি গাছে প্রচুর ফলন আসে। তবে বর্তমানে গাছে কোনো ফুল ও ফল দাঁড়াচ্ছে না। ফলে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৬ কেজি শিমও পাওয়া যাচ্ছে না।
একই কথা জানান, শরিফুল ইসলাম নামে আরেক চাষি। তিনি বলেন, এ বছর আমরা শিম চাষ করে লাভ তো দূরের কথা পুঁজি রক্ষা করতেও পারছি না। অন্যান্য বছরে এ মৌসুমে শিম চাষ করে বিঘাপ্রতি তারা এক থেকে দুই লাখ টাকা আয় করলেও ফলন বিপর্যয়ের কারণে এবার এক বিঘা জমিতে ১০ হাজার টাকাও আয় করতে পারছেন না। ফলে শিম চাষ করে তাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। তিনি বলেন, দিনে-রাতে তাপমাত্রা একই রকম থাকায় শিম চাষের জন্য মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিম চাষের জন্য রাতের তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকলে ভালো হয়। কিন্তু বর্তমান আবহাওয়া শিম চাষের জন্য মোটেও অনুকূল নয়।
এদিকে চলমান বৃষ্টিতেও শিমের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান চাষিরা। একই এলাকার চাষি শফিয়ার রহমান জানান, গত কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের কারণে তাপমাত্রা কমছে বটে। তবে এতেও শিম ক্ষেতের ক্ষতি হচ্ছে। গাছে যেসব ফুল আছে তা ঝরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে শিমের পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ফুল ফলে পরিণত হচ্ছে না। তিনি বলেন, বাজারে শিমের দাম কৃষকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। কিন্তু পোকার আক্রমণে ফলন না থাকায় শিম তুলতে পারছি না। অথচ গত বছর এ মৌসুমে এক বিঘা জমিতে আমরা দুই থেকে তিন মণ পর্যন্ত শিম পেয়েছি।
এ পরিস্থিতির জন্য পরিবর্তিত আবহাওয়াকে দায়ী করেছে কৃষি বিভাগ। এ অবস্থায় পোকা দমনে কৃষকদের জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক মঞ্জুরুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চাষাবাদসহ নানাভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এরপরও শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমাদের চাষিরা এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে শিমের ফলন বিপর্যয় হলেও চলমান বৃষ্টি থেমে গেলে নতুন করে গাছে ফুল আসবে এবং তা পরাগায়নের মাধ্যমে শিমের ফলন বাড়বে। ফলে চাষিরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।