## ক্রেতা সেজে মনিটরিং করা হচ্ছে, মনিটরিং বন্ধ হলেই চালান দেয়া হচ্ছে না
## প্যাকেজ ভ্যাট প্রদানকারী ব্যবসায়ীরা ইএফডি ব্যবহারে আগ্রহী নয়
## অনলাইনে পণ্য বিক্রি করায় দোকানে ক্রেতা আসছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইসিআর, পসের যুগ শেষ। ইএফডি যুগে প্রবেশ করেছে এনবিআর। ইসিআর, পস এনবিআর সরাসরি মনিটরিং করতে পারত না। ফলে হরহামেশাই ভোক্তার দেয়া ভ্যাট জলে যেত। আবার অনেক সময় ভোক্তা থেকে ভ্যাট নেয়া হতো না। এতে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট থেকে বঞ্চিত হতো সরকার। তবে ইএফডি ডেটা সরাসরি এনবিআর মনিটরিং করতে পারবে।

ফলে ভোক্তার দেয়া ভ্যাট ব্যবসায়ীর পকেটে যাওয়া দুষ্কর। ভ্যাট কমিশনারেট থেকে মেশিন মনিটরিং এবং কর্মকর্তারা সরেজমিনে করছেন মনিটরিং। এরপরও ইএফডি থেকে সঠিকভাবে ভ্যাট আদায়কে চ্যালেঞ্জ বলছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব জায়গায় মেশিন বসে গেলে এবং লটারির প্রতিযোগিতা শুরু হলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয় এতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।

চ্যালেঞ্জ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘ইএফডি থেকে আমরা ডাটা পাব ঠিকই, কিন্তু ইএফডির ব্যবহার নিশ্চিত না করা গেলে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে না। ইএফডির সঠিক ব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জের জন্য ইএফডির ব্যবহার সম্পর্কে ভোক্তা ও ব্যবহারকারীদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। মনিটরিং করা হচ্ছে। আমরা লটারি শুরু করব। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। যত ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে সব মোকাবিলা করে আমরা এগিয়ে যাব।’

কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, করোনার কারণে এমনিতে ব্যবসা তেমন নেই। এর ওপর যেসব দোকানে মেশিন বসানো হয়েছে, সেসব দোকানে ক্রেতা যাচ্ছে না। সব দোকানে বসানো ছাড়া সুফল পাওয়া যাবে না। তবে মেশিন দেয়ার আগে ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়ার দাবি জানান তারা। আর যেসব ব্যবসায়ীর টার্নওভার কম, তারা মেশিনে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

অপরদিকে, সম্প্রতি স্থাপিত ইএফডি ও এসডিসির বাস্তবায়ন বিষয়ে কমিশনারেটগুলো থেকে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় এনবিআর। এরই প্রেক্ষিতে ঢাকার চারটি কমিশনারেট ও চট্টগ্রাম কমিশনারেট বাস্তবায়নের প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থাপিত ইএফডি ও এসডিসি এর বাস্তবায়নের তথ্য দেয়া হয়েছে।

ভ্যাট দক্ষিণ কমিশনারেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ৪৫টি ইএফডি ও পাঁচটি এসডিসিসহ মোট ৫০টি স্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০৪টি ইএফডি ও ২১টি এসডিসিসহ মোট ৩২৫টি স্থাপন করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট ৩৪৯টি ইএফডি ও ২৬টি এসডিসিসহ মোট ৩৭৫টি স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে দৈনিক গড়ে ১০টির অধিক চালান ইস্যু করা মেশিনের সংখ্যা ৭৮টি। ৩৭৫টির মধ্যে ৩৩টি জিরো চালান প্রদর্শন করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিরো চালান ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পিক আওয়ারে সরেজমিনে নিবিড় মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়া অপরিচিত ক্রেতা পাঠিয়ে গোপনে তদারকি করা হচ্ছে। রেস্টুরেন্টের ক্ষেত্রে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবারের সময় ইস্যু করা ইনভয়েসের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে বিক্রয় কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে। এ কমিশনারেটের আওতাধীন ইএফডি ও এসডিসি স্থাপন করা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ জুয়েলার্স ও রেস্টুরেন্ট। করোনার কারণে সামাজিক অনুষ্ঠান কম বিধায় স্বর্ণের চাহিদা কমেছে, কমেছে বিক্রি। করোনার কারণে অনেক রেস্টুরেন্ট বন্ধ, খোলাগুলোতে উপস্থিতি কম।

ভ্যাট দক্ষিণ কমিশনারেট সূত্রমতে, ইএফডি ও এসডিসি বিষয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং মেশিনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনটি বড় সেমিনারের আয়োজন করেছে এ কমিশনারেট। এনবিআর চেয়ারম্যান একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন। এছাড়া এনবিআরের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারগুলোতে ব্যবসায়ীরা মেশিনের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরেছেন। সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে মেশিন দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা, যাতে ব্যবসা ও ভ্যাট আহরণের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি না হয়।

ভ্যাট চট্টগ্রাম কমিশনারেটের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ কমিশনারেটের অধীনে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট ১২০টি ইএফডি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে দৈনিক গড়ে ১০টির অধিক চালান ইস্যু করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৫টি। জিরো চালান প্রদর্শন করছে তিনটি। করোনার কারণে বিক্রি কমে যাওয়া ও মেশিন চালানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব থাকায় তিনটি মেশিন থেকে জিরো চালান প্রদর্শন করা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে মেশিন বসানো হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেশিনের অপারেশন করার জন্য হাতে কলমে প্রশিক্ষণ করা হয়েছে। ভোক্তাদের চালান বুঝে নেয়া ও রাজস্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে।

ভ্যাট পশ্চিম কমিশনারেটের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৩২টি ইএফডি ও একটি এসডিসি স্থাপন করা হয়েছে। এরমধ্যে দৈনিক গড়ে ১০টি চালান ইস্যু করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা একটি। ১২টি প্রতিষ্ঠান জিরো চালান প্রদর্শন করছে। একটি দোকানে নাম্বার ভুল থাকায় চালান ইস্যু করেনি। ৮টি প্রতিষ্ঠান বিক্রয় না হওয়ার অজুহাতে চালান ইস্যু করেনি।

সরেজমিন পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানগুলো ইএফডি চালান ইস্যু করার আশ্বাস দিয়েছে। ইএফডি নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় তা ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের অনীহা রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ইএফডি স্থাপন করা হয়েছে তার অধিকাংশই আগের ভ্যাট আইনে প্যাকেজ ভ্যাট প্রদান করত। ফলে ইএফডি চালান ইস্যুতে আগ্রহী হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্রেতা করোনার কারণে অনলাইনে পণ্য ক্রয় করে, ফলে বিক্রি কমে যাওয়ায় চালান ইস্যু কমে গেছে। তবে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।




