নিজস্ব প্রতিবেদক: বন্ধ হয়ে যাওয়া ইভ্যালিকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছে সরকার। বিশেষ করে এই ই-কমার্সে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার এরই মধ্যে ইভ্যালির বোর্ড পুনর্গঠন করেছে। কমিটি ইভ্যালির সাতটি গাড়ি নিলামে প্রায় তিন কোটি টাকায় বিক্রি করেছে। এবার ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার স্ত্রীর ৫০ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের অনুমতি দিয়েছেন হাইকোর্ট। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টরা সরকারের এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, সরকারের নেয়া উদ্যোগের ফলে ইভ্যালি আবার আলোর মুখ দেখবে।
সূত্রমতে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির এমডি মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী ও সংস্থার চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের নামে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশ রাসেলের শ্বশুর-শাশুড়ি ও তার ভায়রাকে হস্তান্তর করার বিষয়ে অনুমতি দিয়েছেন হাইকোর্ট। আইজি প্রিজনকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে বলেছেন আদালত। যদিও শেয়ার হস্তান্তরের পর নতুন গ্রহীতারা আদালতের অনুমতি ছাড়া শেয়ার হস্তান্তর করতে পারবেন না। একইসঙ্গে তারা হাইকোর্টের গঠিত বোর্ডের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। এ বিষয়ে অডিট কর্তৃপক্ষকেও সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ মামলায় রাসেলের শ্বশুর-শাশুড়ি ও তার ভায়রা মামুনুর রশিদকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন আদালত। পাশাপাশি ইভ্যালির ভবন মালিককে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে হাজির হতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তাকে গ্রেপ্তার করে হাজির করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এক আবেদনের শুনানি নিয়ে গতকাল বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতে ইভ্যালির বোর্ডের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার মোরশেদ আহমেদ খান। রিটের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার সৈয়দ মাহসিব হোসাইন। এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইভ্যালির ম্যানেজিং ডিরেক্টরের শ্বশুর-শাশুড়ি ও ভাইবোন আদালতে সশরীরে হাজির হন। তারা আদালতকে জানান, ইভ্যালি পুনর্গঠনের জন্য কাজ করছেন তারা। যারা ইভ্যালির কাছে টাকা-পয়সা ও পণ্য পাবেন, সেগুলো ফেরত দেয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে চান তারা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটা ডিরেকশন দেন, যাতে ইভ্যালির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও চেয়ারম্যানের যে শেয়ারগুলো আছে, সেগুলোর মধ্যে কিছুসংখ্যক শেয়ার যেন তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। তিন মাস ধরে ইভ্যালির কেনাবেচা এবং পণ্য সরবরাহের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের কোনো সংস্থান নেই, কিন্তু ব্যয় যথারীতি রয়েছে। ইভ্যালির ওয়েবসাইট ও অ্যাপস বন্ধ রয়েছে। ফেসবুকেও গত বছরের ১৮ অক্টোবরের পর নতুন কোনো আপডেট আসেনি।
পরে রাসেল ও শামীমার আত্মীয়-স্বজনদের মৌখিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই দিন (৯ ফেব্রুয়ারি) ইভ্যালির এমডি মো. রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের কিছুসংখ্যক শেয়ার তার আত্মীয়-স্বজনের নামে হস্তান্তরে সহযোগিতা করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ইভ্যালির অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালনা বোর্ডকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে নির্দেশ দেন আদালত।
অপরদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিতর্কিত ইভ্যালির সাতটি গাড়ি নিলামে বিক্রি করে প্রায় তিন কোটি টাকা আয় হয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি নিলামে এসব গাড়ি বিক্রি করা হয়েছে। এই টাকা ইভ্যালির গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে কাজে লাগানো হবে বলে জানিয়েছেন ইকমার্স প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চেয়ারম্যান বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। ইভ্যালিতে হাইকোর্টের গঠন করে দেয়া পরিচালনা পর্ষদ গাড়িগুলো নিলামে তুলেছিল। নিলামের তালিকায় ছিল একটি রেঞ্জ রোভার, একটি টয়োটা প্রায়াস, একটি টয়োটা সিএইচআর, দুটি টয়োটা এক্সিও, একটি হোন্ডা ভেজেল ও একটি টয়োটা মাইক্রোবাস। এসব গাড়ির মোট ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা করা হয়েছিল দুই কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। নিলামে দুই কোটি ৯০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা উঠেছে গাড়িগুলোর দাম।
নিলাম শেষে শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘যা মূল্য পেয়েছি, আমরা তাতে আমরা মোটামুটি স্যাটিসফাইড, কারণ ভিত্তি মূল্যের চেয়ে অনেক ওপরে পাওয়া গেছে।’ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির কাছে পণ্য সরবরাহকারী ও কয়েক লাখ ক্রেতার পাওনা রয়েছে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। শামসুদ্দিন বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই চেষ্টা করছি ইভ্যালির পুঁজি বাড়ানোর। বাড়িভাড়া বাবদ খরচ, কর্মচারীর বেতন এবং অন্যান্য পাওনাদার আছেন। ক্রেতা ও সরবরাহকারীরা পাওনাদার আছেন। পয়সাগুলো ইভ্যালির অ্যাকাউন্টে যাবে। সব পাওনাদারদের জন্য এই পয়সাগুলো। পুঁজি বাড়লে পাওনাদারদের যথাসম্ভব পাওনাগুলো দেয়া যাবে।’ নিলামে রেঞ্জ রোভার গাড়িটি এক কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়, টয়োটা প্রায়াসটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকায়, টয়োটা সিএইচআরটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকায়, টয়োটা এক্সিওটি ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়, অন্য এক্সিওটি ১৫ লাখ টাকায়, হোন্ডা ভেজেলটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকায় এবং টয়োটা মাইক্রোবাসটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এই গাড়িগুলো ইভ্যালির কাজে ব্যবহƒত হতো না। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ব্যবহার করতেন। এই গাড়িগুলো আমরা ব্যবহার করতে পারতাম, কিন্তু আমরা চাইনি।’ ইভ্যালির আরও কিছু গাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, সে গাড়িগুলো পাওয়া গেলে সেগুলোও নিলামে তোলা হতে পারে। ইভ্যালির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলের (এখন কারাগারে) পরিচিতজনরা চারটি গাড়ি ব্যবহার করছেন বলে জানান শামসুদ্দিন। বেআইনিভাবে ইভ্যালির গাড়ি আটকে রেখেছে, যেটা আইনের ভাষায় চুরি। রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করব। রোববারের মধ্যে যদি না পাই পুলিশের সহযোগিতা নেব।
নানা প্রতারণার মামলায় রাসেলের পাশাপাশি তার স্ত্রী ইভ্যালির সাবেক চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনও কারাগারে আছেন। ইভ্যালির ধানমণ্ডির কার্যালয়ে নিলাম শেষে শামসুদ্দিন চৌধুরী আরও জানান, কোম্পানি অডিট করার জন্য ২৭ লাখ টাকায় একটি অডিট ফার্ম পাওয়া গেছে। হাইকোর্টের নির্দেশিত অডিট ফার্ম কাজটি করার জন্য ৮৬ লাখ টাকা চেয়েছিল। কিন্তু এত বেশি টাকায় আমরা কাজটি করাতে চাইনি। এখন ইভ্যালির বোর্ডের চার্টার্ডড অ্যাকাউনটেন্ট ফখরুদ্দিন সাহেব হুদাভাসি নামের আরেকটি অডিট ফার্মের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা ২৭ লাখ টাকায় অডিট করতে রাজি হয়েছেন।