ইসরায়েলের হামলায় গাজায় নিহত ১০০

শেয়ার বিজ ডেস্ক : উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো ত্রিমুখী হামলায় প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হামাস-পরিচালিত সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি ও স্থানীয় অধিবাসীরা। স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ইসরায়েল এই হামলা চালায়। নিহতদের মধ্যে রয়েছে শিশুরাও। সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, অন্তত ৯টি বাড়ি এবং বেসামরিক নাগরিকদের তাঁবুর আশ্রয়স্থলে গত বৃহস্পতিবার রাতে বোমা হামলা হয়।

সে সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের কাছ থেকে তারা অসংখ্য কল পেয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও জানায়, আকাশ থেকে স্মোক বোমা ফেলা, কামানের গোলাবর্ষণ এবং ট্যাংক নিয়ে বেইত লাহিয়ায় অভিযান চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ‘উত্তর গাজায় সন্ত্রাসী অবকাঠামো খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে অভিযান’ চালাচ্ছে এবং ‘বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে হত্যা’ করেছে।

গত মার্চে গাজায় নতুন করে ইসরায়েলের অভিযান শুরুর পর থেকে এটি উত্তর গাজায় সবচেয়ে বড় স্থল হামলা বলে মনে করা হচ্ছে। বেইত লাহিয়া থেকে পালিয়ে আসা বাসির আল-গান্দুর বিবিসি-কে বলেন, ‘মানুষ ঘুমিয়ে ছিল, হঠাৎ করে চারদিক থেকে বোমা পড়তে শুরু করল আকাশ থেকে, যুদ্ধজাহাজ থেকে।’

তিনি জানান, তার ভাইয়ের বাড়িতে ২৫ জন ছিলেন, বাড়িটি ভেঙে পড়ে পাঁচজন মারা যান, আহত হন আরও ১১ জন। নিহতদের মধ্যে রয়েছে তার ৫ ও ১৮ বছর বয়সী দুই ভাগ্নি এবং ১৫ বছরের ভাগ্নে। তিনি বলেন, তার ভাইয়ের স্ত্রী এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন।

আরেক বাসিন্দা ইউসুফ সালেম বলেন, ‘আমরা তিন সন্তানসহ অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। পাশের বাড়িতে বোমা পড়ে, কেউ বেঁচে নেই।’ বের হওয়ার চেষ্টা করলে একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন গুলি ছোড়ে বলেও জানান তিনি। পরে পাশের রাস্তা দিয়ে তিনি পালিয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, স্মোক বোমা ফেলে ইসরায়েল প্রথমে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়। পরে কামানের গোলাবর্ষণ শুরু হয় এবং পশ্চিম বেইত লাহিয়ার সালাতিন পাড়ায় ট্যাংক প্রবেশ করে। ইসরায়েলি সাঁজোয়া যানগুলো একটি স্কুল ঘিরে ফেলে, যেখানে শত শত বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়ে ছিলেন।

শুক্রবার সকালে উত্তর গাজার বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট ছড়িয়ে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার
নির্দেশ দেয়, যার ফলে আরও আতঙ্ক ছড়ায়। গাজা শহর থেকে পালিয়ে যাওয়া সানা মারুফ বলেন, ‘আমি জানি না কোথায় যাচ্ছি। খাওয়ার কিছু নেই, পানি নেই, কাপড়চোপড়ও সঙ্গে নিতে পারিনি।’

এই হামলার একদিন আগে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১২০ জনের বেশি নিহত হন। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ১৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েল সরকার হুমকি দিয়েছে, হামাস অস্ত্রবিরতি ও জিম্মিদের মুক্তি দিতে রাজি না হলে গাজায় পুনর্দখল অভিযান চালানো হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের শেষ দিনে এমন বার্তা এলো। তবে দোহায় আলোচনা চলমান থাকলেও কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিত মেলেনি। আরব মধ্যস্থতাকারীরা আরও সময় চাইছেন। জানুয়ারিতে গাজায় হওয়া যুদ্ধবিরতি মার্চে ইসরায়েলের নতুন করে হামলা শুরুর মধ্য দিয়ে ভেঙে যায়।

এরপর থেকে খাদ্যসহ সব ধরনের মানবিক সহায়তায় পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েল, যা জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব দেশগুলোর কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ একে ‘মূল চাপ প্রয়োগের কৌশল’ বলে উল্লেখ করেন। ওদিকে জাতিসংঘের এক সাম্প্র্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার ২১ লাখ মানুষের পুরো জনগোষ্ঠী চরম দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ে ‘উদ্বিগ্ন’। মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে দেশে ফেরার পথে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করা দরকার। অনেকেই না খেয়ে আছেন।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ঢুকে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হওয়ার পর গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে গাজায় অন্তত ৫৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনও ৫৮ জন জিম্মি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৩ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।