এম এ খালেক: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে এই মর্মে তথ্য প্রকাশ করেছেন যে, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া খেলাপি ঋণের হিসাবের মধ্যে অবলোপন করা ঋণাঙ্ক অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অবলোপন করা ঋণাঙ্ক যোগ করলে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানোর একটি বৈধ পন্থা হচ্ছে ঋণ হিসাব অবলোপন করা। কিন্তু ঋণ হিসাব অবলোপন করার অর্থ কোনোভাবেই ঋণের দাবি ত্যাগ বা ঋণ মওকুফ করা নয়। যদিও ‘ঋণ হিসাব অবলোপন’ শব্দ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ মওকুফ বা ঋণের দাবি ত্যাগ করার মতো একটি অবস্থা আমাদের মনে জাগতে পারে। ঋণ হিসাব অবলোপন করা হয় ব্যাংকের লেজারকে ক্লিন দেখানোর জন্য। কোনো ঋণ হিসাব খেলাপি হয়ে পড়লে নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর কিছু শর্তসাপেক্ষে সেই ঋণ হিসাবকে অবলোপন করা হয়। কিন্তু ঋণ হিসাব অবলোপন মানে কোনোভাবেই ঋণের দাবি ত্যাগ করা বা ঋণ মওকুফ করে দেওয়া নয়। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কোনো ব্যক্তির তিন ছেলের মধ্যে দুজন সুস্থ-স্বাভাবিক, একজন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। অতিথি বাসায় এলে ভদ্রলোক তার সুস্থ-স্বাভাবিক দুই ছেলেকে অতিথিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রতিবন্ধী ছেলেটিকে সামনে আসতে দেন না। তাই বলে প্রতিবন্ধী ছেলেটি কিন্তু কোনোভাবেই অস্তিত্বহীন হয়ে যায় না। সে অস্তিত্ববান কিন্তু দৃশ্যমান নয়। অবলোপন করা ঋণও ঠিক তা-ই। এই ঋণ ব্যাংকের মূল লেজারে প্রদর্শিত হয় না; কিন্তু তাই বলে ব্যাংক এ ঋণের দাবি ত্যাগ করে না। সাধারণভাবে সব ধরনের ঋণকে পাঁচটি বিশেষ শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। যে ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধিত হয়, তাকে স্ট্যান্ডার্ড লোন বা নিয়মিত ঋণ বলা হয়। যে ঋণ হিসাব স্ট্যান্ডার্ড ও সাব-স্ট্যান্ডার্ড শ্রেণিকরণের মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে, তাকে ‘স্পেশাল মেইনশন অ্যাকাউন্ট’ বলা হয়। যে ঋণ হিসাব মাঝে মাঝে খেলাপি হলেও আবার নিয়মিত হয়, তাকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড লোন বলা হয়। যে ঋণ হিসাব থেকে ভবিষ্যতে কিস্তি আদায়ের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাকে ডাউটফুল লোন বা সন্দেহজনক ঋণ বলা হয়। ঋণ শ্রেণিবিন্যাসকরণের সর্বশেষ অবস্থা হচ্ছে ব্যাড অ্যান্ড লস। ব্যাড অ্যান্ড লস হিসাব থেকে ভবিষ্যতে আর কখনোই কিস্তি আদায়
হবে না বলে ব্যাংক ধরে নেয়। কোনো ঋণ হিসাব ব্যাড অ্যান্ড লস হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে প্রকল্পের উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের এবং অন্যান্য কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণের পর সেই ঋণ হিসাব অবলোপন করা হয়। অবলোপনের পরও সেই প্রকল্প থেকে ঋণ আদায়ের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়। ব্যাংক যেহেতু নিশ্চিতভাবেই অবলোপন করা ঋণ হিসাব থেকে কিস্তি আদায় হবে না বলে ধরে নেয়, তাই কখনো যদি এ ধরনের হিসাব থেকে কিস্তি আদায় হয় তা সরাসরি ব্যাংকের প্রফিট বলে গণ্য হয়।
ঋণ হিসাব অবলোপন বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত পন্থা। কিন্তু এটা এক ধরনের প্রতারণার শামিল। কারণ এর মাধ্যমে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার সুযোগ দেওয়া হয়। অবলোপন করা ঋণ হচ্ছে খেলাপি ঋণের সর্বনিম্ন পর্যায়। পর্বতপ্রমাণ খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা প্রায়ই ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর দাবি উত্থাপন করে থাকেন। তাদের এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক, এতে কোনোই সন্দেহ নেই। ব্যাংক নিজের টাকায় ব্যবসা করে না। তারা জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে এবং সেই আমানত উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ দিয়ে মুনাফা অর্জন করে। কিন্তু বিনিয়োগ যদি লাভজনক ও নিরাপদ না হয়, তাহলে ব্যাংক বিপাকে পড়তে বাধ্য। ব্যাংক আমানতকারীদের যে হারে সুদ দেয়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে ঋণের ওপর আরোপিত সুদের হার কত হবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর সুদ দেয় ৫ থেকে সোয়া ৫ শতাংশ। এ অবস্থায় ব্যাংকঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসার কথা থাকলেও সে ধরনের কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, খেলাপি ঋণ আদায়ের চরম ব্যর্থতা। ব্যাংকগুলো চেষ্টা করেও খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাফল্য দেখাতে পারছে না। এক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে না পারায় ব্যাংকগুলো ঋণের ওপর আরোপিত সুদের হার কমাতে পারছে না। কারণ ব্যাংকঋণের কিস্তি আদায় করতে না পারলেও খেলাপি ঋণের বিপরীতে তাকে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এ প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের ঋণদান ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তাদের লাভের পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, খেলাপি ঋণাঙ্ক যৌক্তিকভাবে সহনীয় পর্যায়ে কমিয়ে আনতে না পারলে টেকসইভাবে ঋণের সুদের হার কোনো দিনই কমানো যাবে না।
ব্যাংকিং সেক্টরে দুই শ্রেণির ঋণ খেলাপি প্রত্যক্ষ করা যায়। এর একটি হচ্ছে নানা পরিস্থিতির কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে পারেন না। এরা প্রকৃত ঋণখেলাপি। আরেক শ্রেণির উদ্যোক্তা বা ঋণগ্রহীতা আছেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছে করে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন না। এরা হচ্ছেন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এরা খুবই ক্ষমতাবান এবং সব সময়ই সরকারি ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকতে পছন্দ করেন। পরিস্থিতির কারণে যারা ঋণখেলাপি হন, সাধারণত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে তারা কোনো ধরনের সুবিধা পান না। কিন্তু যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তারা ব্যাংক থেকে দাপট দেখিয়ে নানা সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো হওয়া উচিত ছিল। যারা নানা বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না, তাদের প্রয়োজনে নতুন করে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যবান করে তোলা যেতে পারে। যেমন গ্রামাঞ্চলে গরমের দিনে টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেলে নতুন করে পানি ঢেলে পানি তোলার ব্যবস্থা করা হয়; ঠিক তেমনি সত্যিকার ঋণখেলাপিদের নতুন করে ঋণ দিয়ে আর্থিক সামর্থ্য সৃষ্টির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে সক্ষম করে তোলা যেতে পারে। কিন্তু যারা ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন না, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া ঠিক নয়। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপ করাকে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কারণ এরা দেশ ও জাতির শত্রু। এদের কারণে নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা তুলনামূলক স্বল্প সুদে ঋণ পাচ্ছে না।
ঋণখেলাপি কালচারের জন্য শুধু যে ঋণগ্রহীতা বা উদ্যোক্তারাই দায়ী তা নয়, একশ্রেণির অসৎ ব্যাংকারও এজন্য সমভাবে দায়ী। ব্যাংকাররা যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে কখনোই খেলাপি ঋণের পরিমাণ এত বৃদ্ধি পেতো না। বলা যায়, অসৎ ব্যাংকারদের সহায়তা ছাড়া ঋণখেলাপি হওয়া খুব কঠিন। ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে একশ্রেণির ব্যাংকার সিন্ডিকেট করে ঋণ দেন। বিশেষ করে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে এটা বেশি দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে যারা কর্মরত আছেন, দুর্নীতি করলেও তাদের চাকরিচ্যুত হওয়ার তেমন কোনো ভয় নেই। এমনকি শাস্তিও হয় না। তাই তারা কোনো কিছুতেই ভয় পান না। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে দেশে এত বেশি ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনে পরিচালনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার অবকাশ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং তার সঙ্গে আরেকটি ব্যাংক ট্রেজারি ব্যাংক হিসেবে রেখে বাকি ব্যাংকগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। আমাদের মতো একটি ছোট দেশে এত বেশি ব্যাংক পরিচালনার কোনো অবকাশ আছে কি না, তাও ভেবে দেখা যেতে পারে। পৃথিবীতে দুই ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়। এক ধরনের ব্যাংক ব্যবস্থা আছে, যেখানে ব্যাংকের সংখ্যা কম কিন্তু শাখাসংখ্যা বেশি। হয়তো দেখা গেলো, ৮-৯টি ব্যাংক আছে, তাদের শাখাসংখ্যা ২০ হাজার। এই বিপুলসংখ্যক শাখার মাধ্যমে তারা সবার জন্য ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করছে। আবার কোনো কোনো দেশে দেখা যায়, ৩০-৩৫টি শাখা নিয়ে একটি ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনা করছে। সেখানে ব্যাংকের সংখ্যা হয়তো দুই হাজার। আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংকের অনুমোদন না দিয়ে সীমিতসংখ্যক ব্যাংকের প্রচুর শাখা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করা যেতে পারে। যথেষ্ট যাচাই-বাছাই না করে ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার ফলে এই সেক্টরে বর্তমানে অসম প্রতিযোগিতা চলছে। নতুন প্রজšে§র কোনো কোনো ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিং করার মাধ্যমে পুরো সেক্টরকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে, ব্যাংকব্যবস্থা হচ্ছে একটি দেশের অর্থনীতির ধমনীতে রক্তপ্রবাহের মতো। ধমনীতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি ব্যাংকব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলে দেশের অর্থনীতি প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হতে পারে না। তাই আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
