একনেকে ডিপিপি উঠছে কাল: পুকুর খননেও বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব

মাসুম বিল্লাহ জাকারিয়া পলাশ : দেশের ৫৬ জেলার ৯২১টি খাল ও এক হাজার ৬১১টি পুকুর পুনঃখননের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। ‘সারা দেশে পুকুর, খাল উন্নয়ন’ শীর্ষক এ প্রকল্পে এক হাজার ৩৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো পুকুর ও খাল খননের মতো গ্রামীণ প্রকল্প বাস্তবায়নেও প্রশিক্ষণের নামে ২৪ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সেচ অনুবিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। সূত্রমতে, ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের উদ্দেশ্যে এ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ অসাধু ব্যক্তিদের হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা সব সময়ই বলে আসছি, সরকারি ব্যয়ের প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপখাতে টাকা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বণ্টন লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় এতে ন্যায্যতার ব্যত্যয় ঘটে, অনেক ক্ষেত্রে অপচয় হয়, বাস্তবায়নেও দুর্বলতা লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিগুলোর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি আইএমইডি থেকে এসব প্রকল্পের যথাযথ নিরীক্ষণ হওয়া দরকার। এসব প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার জন্য সুশাসন, সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন এবং সাশ্রয়ী নীতির সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন।’

একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হওয়া সারসংক্ষেপ অনুসারে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে এ প্রকল্পটি। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে প্রকল্পের শুরু ধরা হয়েছে, যা শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্পটির প্রস্তাবনায় বলা হয়, এটি বাস্তবায়িত হলে পুকুর ও খালের বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এলজিইডির করা মাঠ জরিপের তথ্যমতে, দেশে ১৪ হাজার ৯১০টি খাসপুকুর বা দিঘি, তিন হাজার ৪৯৩টি ভূ-উপরিস্থ জলাধার এবং তা বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহারের মাধ্যমে বেকার ও দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সারা দেশের পুকুর, দিঘি ও খালের জেলাভিত্তিক তালিকা করে তা খননের প্রাথমিক পরিকল্পনা করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় এলজিইডি মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। এলজিইডির ওই জরিপের তথ্যমতে, দেশে ১৪ হাজার ৯১০টি খাসপুকুর বা দিঘি, তিন হাজার ৪৯৩টি প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর বা দিঘি এবং ছয় হাজার ৫৩৬টি খাসখালের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৫৬টি জেলার ৪০০ উপজেলার ৯২১টি খাল (দুই হাজার ৩৭২ কিলোমিটার) এবং এক হাজার ৬১১টি প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর (এক হাজার ৭০২ একর) পুনঃখননের জন্য প্রকল্পে প্রস্তাব করা হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, নাটোর, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার কোনো খাল বা পুকুরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এজন্য এলজিইডির পক্ষ থেকে সম্ভাব্যতা যাচাইও করা হয়েছে বলে জানানো হয় প্রস্তাবনায়।

প্রকল্পের ব্যয়ের প্রস্তাবে বলা হয়, সরকারি অর্থায়নে সর্বমোট এক হাজার ৩৩৪ কোটি ৯৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয় হবে এ প্রকল্পে। মোট ব্যয়ের মধ্যে খাল খননের জন্য সাড়ে ৬৬ ভাগ এবং পুকুর বা দিঘি উন্নয়নের বিষয়ে ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ ব্যয় ধরা হয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তাদের বেতন, বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্রমণ, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ব্যয় ধরা হয়েছে। খাল ও পুকুর খনন প্রকল্পের এ কাজে তিন ধাপে ২৪ কর্মকর্তাকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের জন্যও দেড় কোটি টাকার মতো অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া মূলধন ব্যয়ের আওতায় চল্লিশটি মোটরসাইকেল ক্রয়, বিএসপিসমৃদ্ধ ডিজিটাল ক্যামেরা ক্রয় ও ২০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ ধরা হয়েছে।