কমিশনের অর্থ নিয়ম ভেঙে ব্যবহার

এজেন্ট ছাড়াই পলিসি সংগ্রহ করছে বিমা কোম্পানি!

রাহমান আরিফ: বিমা ব্যবসা এজেন্টনির্ভর। বিদ্যমান নিয়ম-কানুন মেনে নির্ধারিত কমিশনের ভিত্তিতে এজেন্টরা বিমা সংগ্রহ করে। বিমা আইনে এজেন্ট ছাড়া অন্য কাউকে কমিশন দেয়ার সুযোগ নেই। পলিসি বিক্রি এবং কমিশন দেয়ার সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বীউনিক) দেয়া নিবন্ধন কোড ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু নিয়মে থাকলেও বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানি কমিশনের অর্থ নিয়ম ভেঙে ব্যবহার করছে। ২০২৪ সালে সাধারণ বিমার মোট পলিসির ৪৬ শতাংশের বেলায় কোনো এজেন্টের তথ্য মেলেনি। আর জীবন বিমার বেলায় এজেন্ট ছাড়া সংগ্রহ করা পলিসির সংখ্যা ৪২ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এসব বিমা পলিসির বিপরীতে কমিশনের টাকা কারা নিয়েছে-সেই তথ্য মিলছে না। তাই নিয়ম ভেঙে পলিসি বিক্রি ও কমিশন ব্যয়ের বিষয়ে কঠোর হচ্ছে বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীউনিক।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশের ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানি মোট ৯ লাখ সাত হাজার ১৮৬টি পলিসি বিক্রি করেছে। এর মধ্যে চার লাখ ৮১ হাজার ১৮৬টি পলিসির বিপরীতে এজেন্ট কোড ব্যবহার করেছে কোম্পানিগুলো। বাকি চার লাখ ২৫ হাজার ৯৪২টি পলিসির বিপরীতে কোনো এজেন্টের তথ্য দেয়নি কোম্পানিগুলো, যা ওই বছরে ইস্যু করা মোট পলিসির প্রায় ৪২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এসব পলিসি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, কমিশনের অর্থ কাকে দেয়া হয়েছে-সেই তথ্য দিতে পারেনি কোম্পানিগুলো। তাই এ কমিশনের অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাধারণ বিমা খাতের ৪৬টি কোম্পানি মোট ছয় লাখ ৬৫ হাজার ৯০৮টি পলিসি বিক্রি করেছে। এর মধ্যে তিন লাখ ৫৮ হাজার ৬৭৯টি পলিসির বিপরীতে এজেন্ট কোড ব্যবহার করেছে কোম্পানিগুলো। বাকি তিন লাখ সাত হাজার ২২৯টি পলিসির বিপরীতে কোনো এজেন্টের তথ্য দেয়নি কোম্পানিগুলো, যা ওই বছরে ইস্যু করা মোট পলিসির প্রায় ৪৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। সিংহভাগ কোম্পানিই নিয়ম ভাঙছে।

দেরিতে হলেও কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছে বীউনিক। কোম্পানিগুলোকে বিদ্যমান আইন মেনে চলার তাগিদ দিচ্ছে সংস্থাটি। এজেন্ট কোড ছাড়া পলিসি ইস্যু ও কমিশন ব্যয় বিষয়ে বীউনিকের জনসংযোগ পরামর্শক ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এজেন্ট কোড ছাড়া পলিসি ইস্যু, বিমার কমিশনের অর্থ ব্যয় এবং বীউনিককে তথ্য না দেয়া কোম্পানিগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে আইনি নির্দেশনা মেনে চলার জন্য কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে।’

দায়িত্বশীলরা বলছেন, জীবন বিমার ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম আয় ও কোম্পানির ব্যবসার বয়স বিবেচনায় নিয়ে কমিশন দেয়ার নিয়ম রয়েছে। যদিও কোম্পানিগুলোর সব সময় সেই নিয়ম মেনে চলতে চায় না। আর প্রকৃত তথ্য গোপনের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও তথ্য দেয় না। কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অঙ্গতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি বীউনিক।

তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, সাধারণ বিমার ক্ষেত্রে প্রতিটি পলিসির বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে কমিশন দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এজেন্টটাই এ কমিশন পাওয়ার যোগ্য। কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো সরাসরি বা ব্যাংকের মধ্যস্থতায় বিমা করে। সে ক্ষেত্রে নিয়ম ভেঙে এজেন্ট কোড ছাড়াই বিমা করা হয়। আয় কমিশনের অর্থ বিমা কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারী ব্যাংকের দায়িত্বশীলরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। কখনও কখনও বিমা গ্রাহকের প্রতিনিধিরাও ভাগ পায়। আর এই পলিসির ক্ষেত্রে কোনো এজেন্ট থাকে না। যে কারণে কোনো এজেন্টের তথ্য দিতে পারে না কোম্পানিগুলো। ডিটাইজেশনের পর কোম্পানিগুলোর তথ্য যাচাই করে এসব ফাঁকি চিহ্নিত করছে বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীউনিক।

নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বিমা কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেছেন, বিমায় অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে কমিশন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে পারে না কোম্পানিগুলো। কাগজে-কলমে ব্যয় আইনি সীমায় রাখলেও বাস্তবে তা নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ পর্যন্ত হয়ে যায়। এই ব্যয়ের তথ্য গোপন করতে গিয়ে কিছু কোম্পানিকে নিয়ম ভাঙতে হয়। বিমার পেছনে কোম্পানিগুলো নির্ধারিত হারে কমিশন ব্যয় করতে পারে। যখন এজেন্ট ছাড়া পলিসি সংগ্রহ করা হয়, তখন কমিশনের অর্থই বাড়তি ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হয়। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পেলে সেভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিমা খাতের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কাটাতে এ খাতে স্বচ্ছতা আনতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীউনিক কাজ করছে। আমরা বিদ্যমান আইন মেনেই ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু কিছু কিছু কোম্পানির নিয়ম ভঙ্গের কারণে বিতর্ক তৈরি হয়। এজেন্ট লাইসেন্স নবায়ন না করা, এজেন্ট কোড ছাড়া পলিসি ইস্যু, বিমার কমিশনের অর্থ ব্যয় ও বীউনিককে তথ্য না দেয়ার কারণে যেসব প্রশ্ন উঠছেÑসেই প্রশ্নগুলোর সমাধান করা জরুরি।’