কদর না থাকায় ভালো নেই বাঁশের কারিগররা

প্রতিনিধি, মাদারীপুর: বাঁশের তৈরি পণ্য বাঙালির পুরোনো ঐতিহ্য। বর্তমানে প্লাস্টিক ও পলিথিন সামগ্রীর সহজলভ্যতায় পুরোনো এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু পূর্বপুরুষের এই পেশাকে এখনও ধরে রেখেছে মাদারীপুর জেলার কয়েকটি পরিবার। এখনও তারা তৈরি করছেন ডালা, কুলা, চালুনি, খালুইসহ নানা পণ্য। কিন্তু দিন দিন বাঁশের তৈরি এসব পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় অর্থাভাবে পড়ে ভালো নেই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা। জীবিকার তাগিদে ঐতিহ্যবাহী এই পেশাকে ধরে রাখতে সরকারি সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জীবিকার তাগিদে সাংসারিক কাজের পাশাপাশি বাঁশ ও বেতের তৈরি কুলা, চালুন, খাঁচা, মাচা, মই, চাটাই, ঢোল, গোলা, ওড়া, বাউনি, ঝুঁড়ি, ডুলা, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই, মাথাল, সোফাসেট, বইপত্র রাখার র্যাকসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র, বাঁশের ঘর, বেড়া, ঝাঁপ, বেলকি ও দরমা বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীক। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত খুবই আকর্ষণীয় বিভিন্ন পণ্য বাঁশ দিয়ে তৈরি করেন নারীরা। এরপর সেগুলো বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার পূর্ব স্বরমঙ্গল গ্রামের নারী কুটিরশিল্পী দুর্গা রানী দাস (৫০)। বাঁশ দিয়ে বানানো চটা দিয়ে চালুনি তৈরিতে ব্যস্ত তিনি। তার সঙ্গে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পুত্রবধূ মালা রানী দাস (২৫) ও কন্যা অপর্ণা দাস (২৮)। তাদের বাবা-দাদার কাছ থেকে শিখেছেন এই কুটিরশিল্পের কাজ। এই কাজের উপার্জনের টাকায় চলে তাদের সংসার। কিন্তু বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির দেশে বাঁশের তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে গেছে, বেড়েছে প্লাস্টিকজাত জিনিসের চাহিদা। এজন্য দিন দিন আর্থিক সংকট পড়ছেন কুটিরশিল্পীরা। এতে জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। এদিকে সরকারি সহযোগিতার জন্য একাধিকবার নামের লিস্ট নিলেও কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি এই ক্ষুদ্র শিল্পীরা। দেশের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জীবিকার তাগিদে সাংসারিক কাজের পাশাপাশি বাঁশ কেটে ডালা, কুলা, চালুনি, খালুইসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে থাকেন নারীরা। সেগুলো বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করেন পরিবারের পুরুষরা। যুগ যুগ ধরে চলে আসা পরিবেশবান্ধব নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও বাণিজ্যিক সামগ্রী তৈরির এ ক্ষুদ্র শিল্পগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ নেয়ার দাবি সংস্কৃত ব্যক্তিদের।
নারী কুটিরশিল্পী দুর্গা রানী দাস, মালা রানী দাস ও অপর্ণা দাস বলেন, পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাঁশ কিনে এনে কেটে চটা বানিয়ে দেন। পরে আমরা বুনে ডালা, কুলা, চালুনি, খালুইসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করি এবং সেগুলো রং করে দিই। একবারে ৫০-৬০টি হলে বিভিন্ন হাটে নিয়ে বিক্রি করা হয়।

তারা আরও বলেন, আমাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। আট-নয় বছর বয়স থেকে বাঁশ ও বেত দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির কাজ শুরু করেছি। আগের থেকে এখন একটু কম বিক্রি হয়। তবে টাকা থাকলে ভালোভাবে ব্যবসা করে বেঁচে থাকা যায়। আমাদের ঋষি সম্প্রদায়ের জন্যই এই কাজ। আমাদের পূর্বপুরুষরা করেছেন, আমরাও পরিবারের সবাই এই কাজ করি। ২০ দিনে ৫০টি বানিয়ে পাইকারি বিক্রি করতে পারলে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা লাভ হয়। এই টাকায় আমাদের সংসার চালাতে কষ্ট হয়। সরকারিভাবে সহযোগিতার জন্য কয়েকবার নাম নিয়েছে, কিন্তু কিছুই দেয়নি। যদি সরকার আমাদের কোনো সহযোগিতা না করে, তাহলে আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী কাজ ছেড়ে দিতে হবে।

আরেক কুটিরশিল্পী শুকুমার দাস (৫৫) বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে বাঁশের দাম বেড়েছে। তাই প্রতিটি জিনিস তৈরিতে খরচ হয় ৫৫-৬০ টাকা, আর ৭০-৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারি। এতে প্রতি মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা থাকে। তা দিয়ে ভালোভাবেই চলা যায়। এখনও বাঁশের তৈরি বেশ কিছু জিনিসের চাহিদা আছে। কিন্তু টাকার অভাবে তৈরি করতে পারছি না, তাই বিক্রিও কম হচ্ছে। সরকারি আর্থিক সহযোগিতা পেলে ভালো করে ব্যবসা করা যেত এবং বাবা-দাদাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারতাম।

এ ব্যাপারে রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক বলেন, এরই মধ্যে বাঁশ ও বেতশিল্পীদের তালিকা করা হয়েছে। তাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। এই কাজগুলোকে আরও বেগবান করতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তারা যেন কুটিরশিল্পের কাজ সুন্দরভাবে করতে পারে, সেই লক্ষ্যে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য দ্রুতই সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হবে।