Print Date & Time : 14 May 2026 Thursday 7:53 am

কর ফাঁকি বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম: এবারের আয়কর মেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আয়কর দিতে সক্ষম ব্যক্তির সংখ্যা চার কোটি হলেও কর দেন মাত্র ৩০ লাখ।’ কর ফাঁকি বা কর দিতে অনীহা বাংলাদেশের মানুষের অভ্যাস বলা যেতে পারে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কর ফাঁকি বা অনীহা বলতে কিছু নেই। দেশে রাতারাতি কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, আর সেইসঙ্গে কর দিতে সক্ষম ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে, কিন্তু তারা কর দিচ্ছেন না। ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, ‘দেশে (তখন) কোটিপতির সংখ্যা এক লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন, আর ব্যক্তিপর্যায়ে কর দেন ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৫০৩ জন।’
বর্তমান সরকার অবশ্য কর ফাঁকি বন্ধ ও সক্ষম ব্যক্তিদের কর দিতে বাধ্য করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেমন চলতি অর্থবছরে কর ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে কড়ায়গণ্ডায় হিসাব করে আরও বেশি রাজস্ব আয়ের নানা উদ্যোগের উল্লেখ আছে অর্থ বিলে। এতে একদিকে যেমন রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা রয়েছে, তেমনি কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ, সরকারের নীতিনির্ধারক সবাই মনে করেন দেশের যে পরিমাণ মানুষের আয়কর দেওয়ার কথা, এর সামান্য অংশই কর দেয়। আয়করদাতাদের একটি বড় অংশ আবার নানাভাবে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ভ্যাট ও করের বোঝা না চাপিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্র বন্ধ করে বাড়তি রাজস্ব আয় করার কথা অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সব সময় বলে আসছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সুধীজনরা।
অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করার সময় যে প্রস্তাব তুলে ধরেন, তাতে কর ফাঁকি বন্ধ করার লক্ষ্যে বেশ কিছু কঠোর উদ্যোগের কথা রয়েছে। বাজেট বক্তব্যে এই কঠোরতার কিছুটা ইঙ্গিত থাকলেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে অর্থ বিল, ২০১৮-তে। সাধারণ করদাতা থেকে উচ্চবিত্ত পর্যায়ের সবার জন্য কর ফাঁকি দেওয়ার বড় একটি ক্ষেত্র হলো কথিত ‘উপহার’। নিজের আয় দিয়ে ভরি ভরি স্বর্ণালংকার ও দামি আসবাব কেনার পর করদাতারা রিটার্ন ফাইলে এর কোনো মূল্য দেখায় না। ‘উপহার হিসেবে পেয়েছি’ বা ‘মূল্য জানা নেই’ জাতীয় কথা উল্লেখ করে আয়কর রেয়াত নেয় তারা। অনেক করদাতার স্বর্ণালংকার বা দামি আসবাব না থাকলেও প্রথমবার রিটার্ন দাখিল করার সময়ই ‘উপহার’ হিসেবে বেশি করে স্বর্ণ থাকার তথ্য তুলে ধরে। তাতে ভবিষ্যতে কর ফাঁকি দিয়ে কখনও স্বর্ণালংকারের মালিক হলেও এনবিআর যাতে ধরতে না পারে সেজন্য এই চালাকি করে তারা। অনেকে নিজের টাকাকে অন্যের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ধার বা ঋণ হিসেবে উল্লেখ করে কর ফাঁকি দেয়। চলতি অর্থবছরে উপহার ও ব্যক্তিগত ঋণের নামে কর ফাঁকির এই সহজ পন্থা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এ জন্য আয়কর অধ্যাদেশের ১৯(২১) ধারা প্রতিস্থাপন করার কথা বলা হয়েছে অর্থ বিলে। করদাতার উপহার ও ঋণ দেওয়া সম্পর্কে এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হলে তা করদাতার আয় হিসেবে চিহ্নিত করে এর ওপর আয়কর নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে এক অর্থবছরে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ঋণ বা এর চেয়ে বেশি অর্থের কোনো উপহার পেলে তা করদাতার অন্যান্য খাতে আয় হিসেবে চিহ্নিত করে আয়কর নেওয়া হবে। তবে কোনো করদাতা তার মা-বাবার কাছ থেকে কোনো ঋণ বা উপহার ব্যাংকিং চ্যানেলে পেলে এর ওপর আয়কর প্রযোজ্য হবে না।
দেশে বেসরকারি খাতে কর্মরত অনেকেই করযোগ্য বেতন-ভাতা পেলেও আয়কর দেন না। এবার তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল অনেকটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে অর্থ বিলে। এতে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে কর্মরত প্রত্যেক চাকরিজীবী তার নিয়োগ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবছরের ১৫ এপ্রিলের মধ্যে নিজের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), আয়কর রিটার্ন দাখিলের তারিখ এবং রিটার্ন দাখিলের সময় আয়কর অফিস থেকে দেওয়া সিরিয়াল নম্বর জমা দেবেন। এর আগে প্রতিবছর ১৩ এপ্রিলের মধ্যে বেসরকারি চাকরিজীবীরা তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন। তাতে থাকতে হবে নাম, পদবি, টিআইএন নম্বর, রিটার্ন দাখিলের তারিখ ও রিটার্ন দাখিলের পর কর কর্তৃপক্ষের দেওয়া সিরিয়াল নম্বর। আয়কর অধ্যাদেশের ১০৮ ধারায় নতুন এ বিধান সংযোজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে অর্থ বিলে। তবে এ বিধান সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘বিভিন্ন দফতর ও এজেন্সির কাছে করদাতার যে আর্থিক তথ্য থাকে তা কর বিভাগের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেয়ার করার বিধান সংযোজনের কথা বলেছেন। এর ফলে কর ফাঁকি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে।’ এর মধ্য দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলতে চেয়েছেন, কেউ ব্যাংক, শেয়ারবাজার, সঞ্চয়পত্র কিংবা অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওই তথ্য এনবিআরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানাবে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নির্বাচন কমিশনও করদাতাদের আর্থিক তথ্য জানাবে এনবিআরকে। ফলে কেউ কর দেওয়ার সময় সম্পদের তথ্য গোপন রাখলে তা ধরা পড়বে সহজে। এখানে উল্লেখ করতে হয় এনবিআরকে অন্য যেকোনো সংস্থার চেয়ে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া আছে। এনবিআর চাইলে যেকোনো সংস্থার কাছে যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্য চাইতে পারে। কিন্তু এনবিআরের কাছে কেউ তথ্য চাইতে পারবে না।
বাংলাদেশে এটি খুবই স্পষ্ট যে বিপুলসংখ্যক মানুষের হাতে প্রচুর পয়সা রয়েছে। কিন্তু তারা সঠিকভাবে আয়কর পরিশোধ করছে না। এবার বাজেটে করের হার ও ভিত্তি বাড়ানো হয়নি। তাই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে ফাঁকি দেওয়ার ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এবারের বাজেটে কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হলেও কর ফাঁকির মামলা করার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে থাকার চেষ্টা রয়েছে অর্থ বিলে। আয়কর অধ্যাদেশের ১৬৯ ধারার পর নতুন ১৬৯-এ ধারা সন্নিবেশ করার প্রস্তাব করে অর্থ বিলে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করসংক্রান্ত অপরাধের দায়ে মামলা করার আগে কোনো অপরাধের তদন্ত হওয়ার পরও কর কমিশনারের আগাম অনুমোদন সাপেক্ষে ডেপুটি কর কমিশনার আবার তদন্ত করবেন। এ ছাড়া করদাতাদের কোনো কারণে নোটিস দেওয়ার দরকার হলে আগামী অর্থবছর থেকে কাগুজে নোটিসের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক মেইলের মাধ্যমে নোটিস করা হবে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সম্বোধন করে পাঠানো সুনির্দিষ্ট ই-মেইলই এনবিআরের পাঠানো নোটিস বলে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশে আমদানি-রফতানির নামে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। আমদানির সময় কোনো পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে বাড়তি অর্থ পাচার করছে কোনো কোনো ব্যবসায়ী। আবার রফতানির সময় কোনো পণ্যের দাম কম দেখিয়ে অর্থপাচার করছে তারা। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, এর প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি-রফতানির মাধ্যমে হয়ে থাকে বলে তথ্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। এ ছাড়া বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য দেশে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আমদানি-রফতানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া রোধ করা এবং অর্থপাচার বন্ধ করার জন্য শুল্ক কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা রয়েছে এবারের অর্থ বিলে। তবে সব কথার শেষ কথা হলো সরকারের এই উদ্যোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।

সাবেক কর কমিশনার ও চেয়ারম্যান
এফএফ ফাউন্ডেশন