ফল অত্যাবশ্যকীয় পণ্য

কর মওকুফ, এআইটি কমানো ও আরডি প্রত্যাহারের সুপারিশ

রহমত রহমান: আমদানি করা ফল বিলাসী পণ্য নয়, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। অথচ বিলাসী পণ্য বিবেচনা করে আমদানি করা ফলে সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। সরকার রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করলেও ফলাফল উল্টো হয়েছে। বরং আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায় কমেছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে তাজা ফল আমদানিতে বাড়তি সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।

আবার ফল আমদানির পরবর্তী পর্যায়ে তেমন কোনো প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। এ ছাড়া রিফান্ড নিতে আমদানিকারকদের সময় অপচয় হয়। সেজন্য অগ্রিম কর (এটি) প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে কমিশন। অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়ের জন্য ব্যবসায়ীদের অস্বাভাবিক মুনাফা দেখাতে হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। সেজন্য এআইটি ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে দুই শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে কমিশন। সম্প্রতি ট্যারিফ কমিশন থেকে এনবিআরকে সুপারিশ করে চিঠি দেয়া হয়েছে। ফল আমদানিতে শুল্ককর কমানোর দাবিতে ফল আমদানিকারকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে এ সুপারিশ করা হয়েছে।

চিঠিতে কমিশন বলেছে, ফলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। কিন্তু গত কয়েক বছর ডলারের দাম ও শুল্ককর বাড়ার কারণে ফলের দাম বেড়েছে। শুল্ককর কাঠামো এবং ২০২১-২২ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমদানির চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যেমনÑআপেল আমদানি কমেছে প্রায় ৫২ শতাংশ। এছাড়া মাল্টা আমদানি ৭১ ও আঙ্গুর আমদানি ২৯ শতাংশ কমেছে। তবে গত ৯ জানুয়ারি ফলকে বিলাসী পণ্য বিবেচনা করে এর ওপর সম্পূরক শুল্ক ২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার কারণে আমদানি আরও কমেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির তুলনায় গত জানুয়ারিতে মেন্ডারিন আমদানি কমেছে ৫১ শতাংশ। এছাড়া আঙ্গুর ২১, আপেল ৩, নাশপাতি ৪৬, আনার ও ড্রাগন ফল ৩২ শতাংশ আমদানি কমেছে। কারণ বর্তমানে ৮৬ টাকায় ফল আমদানি করা হলে তার ওপর কর দিতে হয় ১২০ টাকা, যা ভোক্তার জন্য অনেকটা অসহনীয়।

বর্তমানে সব মিলিয়ে ফল আমদানিতে মোট শুল্কভার রয়েছে ১৩৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এক্ষেত্রে কমিশন বলেছে, এটি সমীচীন নয়। উচ্চ শুল্কের কারণে বৈধ পথে আমদানি কমে অবৈধ পথে বাড়বে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে তাজা ফলে অতি মাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। আমদানি কমে গেলে শুধু ভোক্তার ক্ষতি নয়, রাজস্ব আহরণও কমে যাবে। এসব বিবেচনায় ফল আমদানির পরবর্তী পর্যায়ে তেমন কোনো প্রক্রিয়াজাত (মূল্য সংযোজন) করা হয় না, তাই অগ্রিম কর (স্থানীয় পর্যায়ের অগ্রিম ভ্যাট ৫ শতাংশ) আরোপ করা সমীচীন নয়। এতে ব্যবসায়ীদের রিফান্ড নেয়ার জন্য আবেদন করতে হয় এবং তা অনুমোদনের জন্য সময়ক্ষেপণসহ আর্থিক চাপে পড়তে হয়। তাই খাদ্যপণ্য হিসেবে এটি অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে।

চিঠিতে বলা হয়, মোট আমদানি মূল্যের ওপর ১০ শতাংশ এআইটি আরোপের কারণে তা সমন্বয় করতে ব্যবসায়ীদের অস্বাভাবিক মুনাফা দেখাতে হয়, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। বরং এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে রিফান্ড দাবি করার জন্য ব্যবসায়ীকে আর্থিক ও অন্য চাপে পড়তে হয়। তাই এআইটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে দুই শতাংশ করা যেতে পারে। এছাড়া ‘নিত্যপণ্য আইন, ১৯৫৬’ অনুযায়ী তাজা ফল অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। এর ওপর আরোপিত অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার বা যৌক্তিক করা যেতে পারে। কারণ রাজস্ব বাড়াতে এসব শুল্ককর বাড়ানো হলেও আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আনুপাতিক হারে ও প্রত্যাশা অনুসারে বাড়েনি বলে উল্লেখ করেছে কমিশন। সংস্থাটি বলেছে, ‘ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি, ২০২৩’ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কেবল জরুরি প্রয়োজনে আরোপ করা যাবে। কিন্তু ফল আমদানিতে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক রয়েছে। ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় এটিও যৌক্তিক করা যেতে পারে।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ন্যায্য মূল্যে ভোক্তাদের কাছে খেজুরসহ অন্যান্য ফল পৌঁছানোর জন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন জনবহুল স্থানে ফল আমদানিকারকদের মাধ্যমে অস্থায়ী ভ্যান বা ট্রাকের মাধ্যমে খেজুর ও তাজা ফল বিক্রি করার বিক্রি করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফআইএ) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে সরকারকে ফল আমদানিতে শুল্ককর ও শুল্কায়ন মূল্য যৌক্তিক করতে হবে। এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, তাজা ফল আমদানিতে রাজস্ব কমানোর এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কয়েকটি সুপারিশ এরই মধ্যে এনবিআরে জমা হয়েছে।