কুদরতে খোদা সবুজ, কুষ্টিয়া :মানুষের সৌন্দর্যের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ চুল। চুলের প্রকার যেমনই হোক না কেন চুল ছাড়া মানুষ এককথায় শ্রীহীন। সুন্দর কেশরাশি একজন মানুষের সৌন্দর্য ও রূপকে পরিপূর্ণতা প্রদান করে। চুল ছেলেদের ব্যক্তিত্বকে বৃদ্ধি করে। একই ক্ষেত্রে চুল মেয়েদের অলংকার হিসেবে ধরা হয়। তবে যান্ত্রিক এই যুগে পুরুষ অথবা নারীদের চুল নিয়ে পড়তে হয় নানা রকম বিড়ম্বনায়। নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলতে মাথাভর্তি চুলের বিকল্প নেই। তাই সৌন্দর্যবর্ধনে পুরুষ কিংবা নারী নিয়মিত চুল পরিচর্যার পাশাপাশি যাদের মাথায় চুল কম বা মাথা ফাঁকা হয়ে গেছে তারা ঝুঁকে পড়ছে পরচুলা বা নকল চুলের দিকে। ফলে বর্তমানে দেশে-বিদেশে পরচুলার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণে নারীদের আঁচড়ানোর পর ঝরে পড়া চুল অথবা সেলুনের কাটা চুলও এখন মূল্যবান বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এখন তাই হকাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং বিভিন্ন সেলুন ঘুরে এসব চুল টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করেন। ফেলে দেওয়া এই চুলের দাম একেবারে কমও নয়। পরচুলা তৈরির এটিই প্রাথমিক কাঁচামাল।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সাওতা গ্রামে প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী পরচুলা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। বছর দুয়েক আগে এই গ্রামে পরচুলা তৈরির কাজ শুরু করে স্থানীয় কিছু নারী কর্মী। এর পর থেকেই কর্মী বাড়তে থাকে তাদের। বর্তমানে এই পরচুলা তৈরির কাজের সঙ্গে প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী যুক্ত রয়েছেন। সম্ভাবনাময় এই শিল্প গ্রামের মেয়েদের স্বাবলম্বীর পাশাপাশি কর্মদক্ষ করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা এ কাজ করে নিজেদের পড়াশোনার খরচ জোগান দিচ্ছেন। নিজ সংসারের কাজ সেরে গৃহিণীরা এই উপার্জনের অর্থ দিয়ে তাদের সংসারে অতিরিক্ত চাহিদাগুলো পূরণ করছেন।
কুষ্টিয়ার এই পরচুলা দেশের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। ইউরোপে রপ্তানি হলেও চীন-কোরিয়াতে চাহিদা রয়েছে কুষ্টিয়ার মেয়েদের তৈরিকৃত এই পরচুলা। গ্রামীণ মেয়েরা পরচুলা তৈরি করে অর্থনীতিতে ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে তাদের মজুরি নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ।
স্থানীয় কুমারখালী উপজেলার সাওতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত গৃহিণী রজিনা আক্তারের বাড়ি। তিনি জানান, তার স্বামী রায়হান পেশায় একজন ভ্যানচালক। স্বামীর রোজগারে কোনো রকমে সংসারটা চলে। ছেলে-মেয়ের পড়ার টাকা ও সংসারের টুকিটাকি বিষয়গুলো পরচুলা তৈরির টাকা দিয়ে জোগান দেয়া হয়।
রজিনা আক্তার বলেন, বছর দুয়েক আগে যখন কাজ শুরু করি তখন একটা পরচুলা ক্যাপ তৈরি করে ৫০০ টাকা পেতাম। এখন পাই মাত্র ২০০ টাকা। পরিশ্রম অনুযায়ী ২০০ টাকা অনেক কম, তাই কাজের আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। এর পর থেকে মেশিনে সেলাই করলে বেশি রোজগার হয়। সামনে মজুরি না বাড়ায় কাজ বাদ দিয়ে দেব।
একই গ্রামের গৃহিণী দিপা জানান, তার স্বামী হাসান খড়ির ব্যবসা করেন। এখন ২০০ টাকা মজুরি দেয়, তার পরও মজুরি আটকিয়ে রাখে। সময়মতো বিল পরিশোধ করে না। আগের তুলনায় গ্রামের অনেক মেয়ে কাজ বাদ দিয়ে দিয়েছেন, ভালো কাজ পেলে তিনিও এই কাজ বাদ দিয়ে দেবেন।
সাওতা গ্রামের সব পরচুলা নারী শ্রমিক দাবি করেন, মজুরি আবার আগের মতো ৫০০ টাকা করে দিলে সবাই কাজে ফিরবেন এবং তারা ন্যায্য মজুরি পাবেন।
স্থানীয়রা জানান, গ্রামের মেয়েরা একসময় এই কাজ করে মাসে আট থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত রোজগার করেছেন। এখন চার-পাঁচ হাজার টাকার বেশি কাজ করতে পারেন না।
তারা বলেন, যদি পল্লী উন্নয়ন কর্মসংস্থান বা সরকার এই মজুরি সমস্যা সমাধানে সহযোগী হয়, তাহলে এ কাজের আরও প্রসার ঘটবে। এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির বিকল্প নেই, তা না হলে অচিরেই এই শিল্প হারিয়ে যাবে।
পরচুলা সরবরাহকারী নারী উদ্যোক্তা পপি বলেন, ঝিনাইদহ থেকে কাজের কাঁচামালসহ অর্ডার দিয়ে যান পরচুলা ক্যাপের মহাজনেরা। যারা কাজ দেয় তারাই মজুরি কমিয়ে দিয়েছে, মজুরির ব্যাপারে কথা বললে তারা বলেন, এখন দাম কম যাচ্ছে, দাম বাড়লে মজুরি বাড়িয়ে দেব, কিন্তু তারা মজুরি বাড়ান না।
স্থানীয় চাপড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ইউপি) এনামুল হক মনজু বলেন, গ্রামের মেয়েরা বিভিন্নভাবে উদ্যোক্তা ও স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন শুনেছি। কিন্তু পরচুলার মজুরি এত কম দেয়া হচ্ছে, তা জানতাম না। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বারদের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে বলব এবং ন্যায্য মজুরি পাওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।
কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাজী রবিউল ইসলাম বলেন, পরচুলা একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। এই শিল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ মেয়েরা একদিকে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে তারা ভূমিকা রাখছেন। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং গ্রামের মেয়েদের ন্যায্য মজুরি পেতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স।