রহমত রহমান: দেশের নামি রেস্টুরেন্ট ব্র্যান্ড খানা’স। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নিবন্ধনের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন সুবিধা নিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ভিন্ন কমিশনারেটে অবস্থিত তিনটি ইউনিট অবৈধভাবে কেন্দ্রীয় নিবন্ধনের আওতায় রাজস্ব না দিয়ে নিবন্ধন ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। তবে তিনটি ইউনিট কেন্দ্রীয় নিবন্ধনের আওতায় ঘোষণা করা হয়নি। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৬ কোটি টাকার বিক্রয় তথ্য গোপন করেছে, যার বিপরীতে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম) এর কর্মকর্তারা এই ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন ও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সম্প্রতি এই মামলা করা হয়। ভ্যাট পশ্চিম কমিশনারেটের কমিশনার সৈয়দ মুসফিকুর রহমান শেয়ার বিজকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মামলার বিবরণীতে বলা হয়, খানা’স ভ্যাট পশ্চিম কমিশনারেটের আওতাধীন মিরপুর বিভাগীয় দপ্তরের অধিক্ষেত্রাধীন কেন্দ্রীয় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। ভ্যাট কর্মকর্তারা গোপন সংবাদের ভিতিত্তে জানতে পারেন যে, প্রতিষ্ঠানটি তিনটি ইউনিট ঘোষণা না দিয়েই তাদের বিক্রয় তথ্য গোপন করে আসছে। সব ইউনিটের বিক্রয় হিসাব গোপন করে ভ্যাট চালান ছাড়া সেবা সরবরাহ করে। বিক্রয়ের কাগজপত্র আলাদাভাবে গোপনের মাধ্যমে অন্যত্র সংরক্ষণ করার মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি উপ-কমিশনার উম্মে নাহিদা আক্তার, রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস, মো. আইয়ুবের নেতৃত্বে ভ্যাট মিরপুর বিভাগীয় দপ্তরের একটি দল ভাটারা এলাকায় খানা’স এর একটি কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। এই কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত বিক্রয়ের দলিলাদি সংরক্ষিত রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠান তল্লাশি করে বাণিজ্যিক হিসাবসংবলিত তথ্য ও বিক্রয় সংক্রান্ত দলিলাদি জব্দ করেন।
- কর্মকর্তারা আরও দেখতে পান, একজন কম্পিউটার অপারেটর বিভিন্ন শাখা থেকে পাঠানো দৈনিক বিক্রয় ও কাঁচামাল ক্রয়ের হিসাব সফটওয়্যারে এন্ট্রি দিচ্ছে। কর্মকর্তারা সেখান থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিপোর্টের কপি জব্দ করেন। ওই কম্পিউটার অপারেটর ভ্যাট কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, এন্ট্রি করার পর এসব কাগজ নষ্ট করে ফেলা হয়, যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে। পরে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইউনিটভিত্তিক মাসিক বিক্রয় তথ্য উদ্ধার করেন। জব্দ করা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সাতটি ইউনিট বা ব্রাঞ্চের বিক্রয় তথ্য সফটওয়্যারে এন্ট্রি করা হয়েছে। ইউনিটগুলো হলো এফএমসি, ক্লাব হাউস, ধানমন্ডি, মিরপুর, খিলগাঁও, জয়স ক্রাফট ও পূর্বাচল। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধনে পাঁচটি ইউনিট ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে-আদাবরের ইএনএ, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার খানা’স, ধানমন্ডির খানা’স, মিরপুর খানা’স ও বসুন্ধরা খানা’স। অর্থাৎ এফএমসি, জয়েস ক্রাফট ও পূর্বাচল-এই তিনটি ইউনিটের ঘোষণা না দিয়েই অবৈধভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠান।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খানা’স এর ক্লাব হাউস ২০১৯ সাল থেকে ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট চার্ট পাওয়া গেছে। এই চার্টে ক্লাব হাউসের বিক্রয়ের বর্ণনায় উত্তরা-১৩ ব্রাঞ্চ, উত্তরা মেট্রো ব্রাঞ্চ, মোহাম্মদপুর ব্রাঞ্চ ও মিরপুর ব্রাঞ্চের ফ্রাঞ্চাইজি বিক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হাংরি নাকি, সহজ ফুড, পাঠাও ফুড ও ফুডপান্ডার মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করেছে, দলিলালে তার কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ওই দলিলালে পূর্বাচল শাখার নামে কিছু বিক্রয় তথ্য রয়েছে। কিন্তু পূর্বাচলে কোনো শাখা কেন্দ্রীয় নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত নেই। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহকৃত সেবার প্রকৃত বিক্রয়মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। সরবরাহকৃত সেবার মূসক আরোপযোগ্য বিক্রয় মূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। যাতে প্রযোজ্য মূসক প্রায় সাড়ে ৫৩ লাখ টাকা। আর সরবরাহকৃত সেবার সম্পূরক শুল্ক আরোপযোগ্য বিক্রয়মূল্য প্রায় পৌনে ৫ কোটি টাকা। যাতে প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক প্রায় সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়ের ওপর প্রযোজ্য মূসক ও সম্পূরক শুল্ক প্রায় সাড়ে ৯৮ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি বেভারেজের বিক্রয়কে সম্পূরক শুল্ক ছাড়া বিক্রয় হিসাব করেছে। অর্থাৎ সাড়ে ৪৭ লাখ টাকার সম্পূরক শুল্ক ও মূসক প্রায় ৫১ লাখ টাকাসহ মোট প্রায় সাড়ে ৯৮ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। যার ওপর সুদ প্রায় দেড় লাখ টাকা। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটির ফাঁকি প্রায় ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।
- অপরদিকে, প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজ থেকে মাসিক ভিত্তিতে ইউনিটগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বেভারেজের বিক্রয়ের সম্পূরক শুল্ক ছাড়া বিক্রয় হিসাব দেখিয়েছে। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি এই সময়ে প্রায় এক কোটি ৫৯ লাখ টাকার সম্পূরক শুল্ক ও প্রায় দুই কোটি ৩৭ লাখ টাকার মূসকসহ প্রায় তিন কোটি ৯৬ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। যাতে প্রযোজ্য সুদ প্রায় ৮০ লাখ টাকা। সুদসহ মোট রাজস্ব ফাঁকি প্রায় ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এছাড়া বাড়িভাড়ার ওপর ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে প্রায় ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, যাতে প্রযোজ্য সুদ প্রায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। সুদসহ ভ্যাট ফাঁকি প্রায় ২০ লাখ ৩১ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মোট ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩১৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছেন কর্মকর্তারা। রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

কমিশনার সৈয়দ মুসফিকুর রহমান জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আউটলেটে ভ্যাট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। যাতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। আউটলেটে সফটওয়্যার থেকে এক মাসের তথ্য চেয়েছে ভ্যাট কর্মকর্তারা। কিন্তু আউটলেটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক মাসের নয়, মাত্র এক দিনের হিসাব দেয়া যাবে। বাকি তথ্য সফটওয়্যারে অটো লুকানো থাকে, যা তারা দেখতে পান না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সফটওয়্যার এনবিআর অনুমোদিত নয়। অর্থাৎ রাজস্ব ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রয় তথ্য সফটওয়্যারে গোপন করে রাখে। আর কেন্দ্রীয় নিবন্ধনের অপব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানটিতে নজরদারি বৃদ্ধি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অভিযান ও মামলার বিষয়টি স্বীকার করেন খানা’স-এর মিরপুর ইউনিটের ব্যবস্থাপক মারুফ। তিনি শেয়ার বিজকে জানান, বিষয়ে যে কর্মকর্তা দেখেন তিনি সম্প্রতি যোগদান করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করবেন। তবে পরে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়নি।