মুস্তাফা মাসুদ: রফিক খোন্দকার বড় শৌখিন আর সোজাসাপ্টা মানুষ। কোনো দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়ম আর ধানাইপানাই তার একেবারেই পছন্দ নয়। অসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বলে আয়েশি অলস জীবনযাপন করেন না। খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা, ওঠাবসা, কথাবার্তা, লেনদেনÑসর্বক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ আর কঠোর নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখেন; একচুল হেরফের হওয়ার উপায় নেই। তিনি প্রতি মাসে ব্যাংকে গিয়ে পেনশনের টাকা তোলেন। বিদ্যুৎ বিল দেন। গ্যাস সিলিন্ডার কিনে আনেন। নিয়মিত বাজারে গিয়ে সদাইপাতি কেনেন। তার ওপর রোজ একদেড় ঘণ্টা হাঁটা একেবারেই বাধ্যতামূলক।
পৈতৃক সূত্রে বেশকিছু কৃষি-অকৃষি জমি পেয়েছেন খোন্দকার সাহেব। তিনি লক্ষ করেছেনÑগ্রামে বেশির ভাগ মানুষই নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দেয় না। কিন্তু তিনি অন্যান্য বিষয়ের মতো এ ক্ষেত্রেও সিরিয়াস এবং পাংচুয়াল। চার বছর ধরে তিনি গ্রামে সেটেল্ড। এর আগে ঢাকায় থাকার সময় প্রতি বছর চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে বাড়ি এসে নিজে সব জমির খাজনা দিয়ে যেতেন ভূমি অফিসে গিয়ে। গ্রামে সেটেল হওয়ার পরও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। সেজেগুজে ভূমি অফিসে জমির খাজনা দিতে যাওয়া তার কাছে ভারি আনন্দের একটা কাজ। শুধু আনন্দই নয়, খাজনা দেয়ার বিষয়টি তার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। এই স্বাধীন দেশের কিছুটা ভূখণ্ড একান্তভাবেই তার নিজের অধিকারে; তার বংশধরদের অধিকারেÑ এই বোধ তাকে তৃপ্ত করে; আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জীবিত করে। তাই কৃষি-অকৃষিÑকোনো জমির খাজনাই তিনি কখনই বাকি রাখেন না। এ ব্যাপারে তার সাফকথা: সরকার চলে জনগণের খাজনা-ট্যাক্সের টাকায়। তা পরিশোধ না করলে সরকার চলবে কীভাবে! দেশের উন্নয়নই-বা হবে কীভাবে! এমন সাফকথার জন্য গ্রামের কেউ কেউ তাকে নিয়ে জনান্তিকে ঠাট্টাতামাশাও করে: শহর থে নতুন আয়ছে তো, তাই এট্টু বেশি ভাব দেহাচ্ছে। কেউ বলে: বুড়োর দেমাগ আছে; তয় কথাডা কিন্তু অল্যাজ্য কয়নি। কেউ আবার ফোঁড়ন কাঠে: আরও কিছুদিন যাক, সব ফট্টিফটাং চলে যাবেনে। এহানে শহরের দস্তুর চলে না, চাচা।
আজ সোমবার। চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ। রফিক খোন্দকার সকালের নাশতা খেয়ে কাপড়চোপড় পরেন। যতœ করে তাতে সেন্ট স্প্রে করেন। ধোপদুরস্ত পায়জামা-পাঞ্জাবিতে দারুণ মানিয়েছে তাকে। এই ষাটোর্ধ বয়সেও মাথাভর্তি চুলÑসবটা তেমন পাকেওনি। সাদা, কালো আর বাদামির মিশেলে চুলগুলো এক বিশেষ সৌন্দর্যে চিক চিক করে। রফিক সাহেব তার প্রিয় চুলগুলোয় চিরুনি চালিয়ে আরও বিন্যস্ত আর পরিপাটি করছেন। তখনই মিসেস রফিক মানে রাশেদা বেগম বলেন: হ্যাঁ গো, দক্ষিণ পাড়ার সুলতান এসেছে। তোমার সঙ্গে নাকি জরুরি কথা আছে। ড্রয়িংরুমে বসা আছে।
রফিক সাহেব একটু পর ড্রয়িংরুমে আসেন। সুলতান দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দেয়। সে উপজেলা সদরের বাজারে একটি আইটি ফার্ম চালায়। ভারি চটপটে আর বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে। রফিক সাহেব তাকে ডেকেছেন কম্পিউটারের কিছু বিষয় শেখার জন্য। এমনিতে তিনি কম্পিউটারে লিখতে পারেন, খবরের কাগজও পড়তে পারেন। কিন্তু ওতে তার চলছে না। বর্তমানে দেশে ইনফরমেশন টেকনোলজির যেরূপ অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, সেক্ষেত্রে কম্পিউটার সম্পর্কে ওইটুকু বিদ্যে দিয়ে তার আর চলছে না। তাই সুলতান এসে রোজ সকালে তাকে একটু তালিম দিয়ে যাবে। অবশ্য এজন্য তাকে উপযুক্ত সম্মানি দেবেন তিনি।
রফিক সাহেবকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে সুলতান: দাদা, কোথাও যাচ্ছেন বুঝি? হ্যাঁ রে ভাই… কোথায়… ভূমি অফিসে। বাংলা বছর শেষ হতে আর মাত্র দুদিন বাকি। তাই যাচ্ছি জমির খাজনা দিতে। খাজনা দিতে! ভূমি অফিসে… যেন আকাশ থেকে পড়লে ভায়া! খাজনা দিতে ভূমি অফিসে যাব না তো মৎস্য অফিসে যাব নাকি? মাই ডিয়ার ইয়াং দাদু, ডিজিটাল বাংলাদেশে বসে আপনি অ্যানালগ মানুষের মতো কথা বলছেন। মানে? মানে হলো: বাংলাদেশে এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রামে-গঞ্জে, ঘরে-ঘরে বিস্তৃত হয়েছে। যাদের ঘরে স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার/ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট-ওয়াইফাই আছে, দুনিয়া তাদের হাতের মুঠোয়। এখন ঘরে-ঘরে বিদ্যুৎ আছে। কম্পিউটারও আছে গ্রামের অনেক বাড়িতে। স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট-ওয়াইফাইও আছে বহু বাড়িতে। তাই ঘরে বসেই এখন অনেককিছুই করা যায়। আপনার বাড়িতেও তো এসব সুবিধে আছে… সংক্ষেপে বলো ভায়া। আমাকে আবার ভূমি অফিসে….যেতে হবে না। মানে? আপনার এই কম্পিউটার দিয়ে ঘরে বসেই খাজনা দিতে পারবেন। আপনার মোবাইল ফোন দিয়েও পারবেন।
রফিক সাহেব এবার ঘোরলাগা মানুষের মতো তো-তো করেন আর তাকিয়ে থাকেন সুলতানের মুখের দিকে। ডিজিটাল বাংলাদেশ’র নানান বিস্ময়ের কথা তিনি শুনেছেন, ভাসাভাসা জানেনও কিছু কিছু। তারপরও সুলতানের কথায় তিনি যেন খেই হারিয়ে ফেলেছেন। তবে, সুলতান যে মিথ্যা বলছে না তাও তিনি বুঝতে পারেন। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন: তাই নাকি ভায়া! তাহলে তো খুব ভালো হয়! তো ভায়া, দেখাও তো তোমার ডিজিটাল জাদু? দেখি, শিখি আর নিজেও অ্যাপ্লাই করি। তবে এখনি পারব না; তুমি শিখিয়ে দিলে একসময় অবশ্যই পারব। দিচ্ছি। তবে তার আগে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র আমাকে দেন। আপনার ফোন নম্বরও লাগবে, কিন্তু তা আমার মুখস্থ আছে। আপনি আইডি কার্ডটা নিয়ে আসুন, ওতে জš§তারিখও আছে।
রফিক সাহেব তক্ষুনি এনআইডি কার্ড নিয়ে এলেন। এবার সুলতান রফিক সাহেবের কম্পিউটার ওপেন করে, তারপর িি.িষফঃধী.মড়া.নফ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট বক্সে রফিক সাহেবের মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ লেখে। এর পরপরই রফিক সাহেবের মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ৬ ডিজিটের একটি ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ডÑ মাত্র একবার ব্যবহারযোগ্য সুরক্ষা কোড) কোড ভেসে ওঠে। সেই কোড লিখে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করলে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। তখন সুলতান বলে: দাদু, রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে। এখন আপনার প্রোফাইলের জন্য একটি পাসওয়ার্ড দরকার; সেটি আপনি নিজে লিখুন, গোপন তো সেজন্য।
রফিক সাহেব একটু ভেবে একটা পাসওয়ার্ড লেখেন তারপর সুলতানকে বলেন: ভায়া, লিখেছি। এখন? এখন এই পাসওয়ার্ড দিয়ে আপনার আইডিতে লগইন করুন। লগইন করার পর খতিয়ান অপশনে গিয়ে খতিয়ানের প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি দিলেই কম্মকাবার। এখন খতিয়ানটা আনুন এবং খতিয়ানের তথ্যাবলি লিপিবদ্ধ করুন। এরপর এ পর্যায়ের কাজ শেষ হবে।
রফিক সাহেব রাশেদাকে বলেন, খতিয়ানের ফাইলটা দাও। ঘরে টেলিভিশনের পাশেই রেখেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিসেস রফিক ফাইলটা নিয়ে আসেন। রফিক সাহেব উৎসাহের সঙ্গে নির্ধারিত ঘরে খতিয়ানের তথ্যাবলি লিপিবদ্ধ করেন। তারপর বলেন: কমপ্লিট, ভায়া। এরপর? এরপর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে খাজনার টাকা বিকাশ করুনÑ খাজনার পরিমাণ তো আগেই জেনেছি, তাই না? আচ্ছা উঠুন, এ কাজটি না হয় প্রথমবার আমিই করে দিচ্ছি; এর পর থেকে আপনি করবেনÑ বলেই সুলতান কম্পিউটারের দখল নেয় এবং বলে মোবাইলে পর্যাপ্ত টাকা আছে তো? আছে। ও. কে। যা রে যা টাকা ছাইড়া দিলাম তোরে; উইড়া উইড়া জমা হয়ে যা সরকারের ঘরে। হা-হা-হা, দাদু হয়ে গেছে! খাজনার টাকা জমা হয়ে গেছে। মজার জাদু, না দাদু?
হ্যাঁ, মজার জাদু-ই; তবে ডিজিটাল জাদু। সত্যি ভায়া, চিন্তাই করা যায় নাÑ বাংলাদেশ ইনফরমেশন টেকনোলজিতে এত বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করেছে! ভবিষ্যতে আরও কত ‘জাদু’ অপেক্ষা করছে, কে জানে! জীবনটা এখন কত সহজ আর সুন্দর হয়েছে বিজ্ঞানের আশীর্বাদেÑ নির্দিষ্ট করে বললে, তথ্যপ্রযুক্তির স্বর্ণালি স্পর্শে! সুলতান ভায়া, আমার মনটা আজ ভারি খুশিÑ হƒদয় আমার নাচেরে আজিকে/ময়ূরের মতো নাচেরে!’ জয়তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা! জয়তু ভূমি মন্ত্রণালয়। এভাবেই আমার প্রিয় দেশটা পৌঁছে যাক উন্নতি-অগ্রগতি আর সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে এই কামনা করি।
পিআইডি নিবন্ধ