প্রতিনিধি, গাংনী (মেহেরপুর): আধুনিক যুগে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এলপিজি গ্যাস। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দাহ্য পদার্থ বিক্রি করতে হলে ট্রেড লাইসেন্সের পাশাপাশি বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স ও অগ্নিনির্বাপক কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি। এতে বাড়ছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, অভিযান চলছে এবং চলবে।
‘পেট্রোলিয়াম মজুত আইন, ২০১৮’-তে বলা হয়েছে, কোনো পেট্রোলিয়াম মজুতাগার, স্থাপনা, ফিলিং স্টেশন, ড্রাম, ট্যাংক, শোধনাগার ও পরিবহন যানে ‘ধূমপান বা আগুন নিষিদ্ধ’ সতর্কবাণী-সংবলিত সাইনবোর্ড বা লেবেল লাগাতে হবে। ২০০৪ সালের এলপিজি মজুত সংরক্ষণ আইনে বলা হয়েছে, বিস্ফোরক লাইসেন্স ব্যতীত কেউ এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার মজুত করতে পারবে না। গ্যাস সিলিন্ডার মজুত স্থান সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সেখানে কোনো প্রকারের আগুন বা বৈদ্যুতিক সংস্পর্শ না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
গত শনি ও রোববার জেলার বামন্দী, কাথুলী, কেদারগঞ্জ, দারিয়াপুর, হেমায়েতপুর ও মড়কা রাইপুর জোড়পুকুর গাংনী শহরের অলিগলিতে মুদি দোকান, তেলের দোকান, আবাসিক ভবন, পানের দোকান, ঝুপড়ি, চায়ের দোকান, এমনকি ওষুধের দোকানেও অবাধে বিক্রি হচ্ছে গ্যাসের সিলিন্ডার ও পেট্রোল। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশসহ জনবহুল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এলপিজি সিলিন্ডার গুদামজাত করা হয়েছে। অধিকাংশ দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। কিছু দোকানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র টানানো থাকলেও তা অকেজো ও মেয়াদোত্তীর্ণ।
তিনি জানান, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়ে কোনো প্রকারের লাইসেন্স প্রয়োজন পড়ে কি না, তা জানা নেই। বাজারের অনেক দোকানেই তো গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হয়। একেবারে ফুটপাতে সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কেউ তো কিছু বলে না।
গাংনী বাজারের সিরাজ সাইকেল স্টোরের সামনে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার। সিলিন্ডারগুলো রাখা হয়েছে একেবারে সড়কের পাশে একটার ওপর আরেকটা করে। কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। একইভাবে রাইপুর বাজারে আল-আমিনের ইলেকট্রনিক্স স্টোরেও রাখা হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার। রাখা হয়েছে দোকানের সামনে একটি টেবিলের ওপর বোতলে সাজিয়ে দাহ্য পদার্থ পেট্রল। জানতে চাইলে দোকানি আল-আমিন জানান, সড়কে চলাচলরত মোটরসাইকেল আরোহীরা এখান থেকে পেট্রোল কিনে থাকেন। চাহিদার কারণে দোকানে পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছে। বিস্ফোরক লাইসেন্স প্রয়োজন হয় কি না, জানা নেই।
মেহেরপুর জেলা ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের পরিদর্শক আবদুস সালাম জানান, জেলায় মোট ৩০০টি প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির ব্যবসা করছে। এর বাইরেও অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করে থাকে। তাদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. আসাদুল ইসলাম জানান, জনবল সংকটের কারণে তারা জেলা পর্যায়ে অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি তদারক করতে পারছেন না। এরপরও খুলনা বিভাগের ১০টি জেলায় মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হচ্ছে।
মেহেরপুর পলিটেকনিক কলেজের শিক্ষক আল মাহমুদ শুভ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠা গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জীবনহানির মতো দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গ্যাস ব্যবহারকারীদেরও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন হওয়া আবশ্যক।
মেহেরপুরের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন মাস্টার জাহিদ হোসেন বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করতে হলে অবশ্যই ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র লাগবে। কিন্তু মেহেরপুরে দোকানিরা তা না নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েক দিন ধরে বেশ কয়েকটি আবেদন জমা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক আজিজুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরক লাইসেন্স ছাড়া এবং অনুমোদনহীন অবৈধ গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে মেহেরপুরের দুটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযান চলছে এবং চলবে।