বিশ্ব অর্থনীতি ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, কিন্তু গত বছরের বহুমুখী ধাক্কা এবং চ্যালেঞ্জের কারণে ২০২৩ সালে অর্থনীতি স্থবির হতে পারে। যে তিনটি রাষ্ট্রকে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীন) মনে করা হয় বিশ্ব প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন ২০২৩ সালে এ রাষ্ট্রগুলোর প্রবৃদ্ধি মন্থর হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি এবং ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি, কঠোর আর্থিক অবস্থা, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী কভিড-১৯ মহামারি এবং সরবরাহ-চাহিদার অসঙ্গতি আরও মন্থর করেছে বিশ্ব অর্থনীতিকে।
আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিভা সতর্ক করেছেন, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ মন্দার মধ্যে পড়তে পারে। এমনকি যে দেশগুলো মন্দার মধ্যে থাকবে না সেসব দেশেরও লাখ লাখ মানুষ মন্দার চাপ অনুভব করবে বলে তিনি হুশিয়ারি করেছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুধু লাখ লাখ ইউক্রেনীয়দের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে তা নয়; বরং খাদ্য, জ্বালানি ও এনার্জির ক্ষেত্রে ক্রমাগত ঢেউ অনুভূত হয়েছে এবং আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। যার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং অনেক দেশে মুদ্রাস্ফীতির চাপ অনুভূত হয়েছে। উপরন্তু, জলবায়ুু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে নেতিবাচক ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং ক্রমবর্ধমান এনার্জির দাম বৃদ্ধি সবুজ রূপান্তরের পথকেও বাধাগ্রস্ত করেছে।
ক্রমাগত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো ক্রমবর্ধমান ঋণের দুর্বলতা সৃষ্টি করেছে এবং পুনরুদ্ধারের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে, যা দুর্বল গোষ্ঠীগুলোকে বিশেষত নি¤œআয়ের এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের মন্থরতা, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ, ব্যক্তিগত মূলধন প্রবাহ এবং রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস বিশ্ব মন্দাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। উন্নত বিশ্বের সম্ভাব্য মন্দা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ম–দ্রার অবমূল্যায়ন করতে বাধ্য করবে, যার ফলে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং ফলস্বরূপ সুদের হার বৃদ্ধি পাবে।
সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী মন্দার ঝুঁকি তীব্রভাবে বেড়েছে। কারণ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রাস্ফীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে সুদের হার বাড়িয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে যে সমস্ত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে তা যথেষ্ট নয় বলে এখন পর্যন্ত ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের আস্থা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে। এটা আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, যদি সরবরাহ ব্যাহত না হয় এবং শ্রমবাজারের চাপ কমে যায়, তাহলে বিশ্বব্যাপী মূল মুদ্রাস্ফীতির হার উচ্চ থাকতে পারে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহের বাধা দূর করার জন্য বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করা হবে মূল বিষয়। এখন সময় এসেছে একটি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উন্নীত করার, যা সুরক্ষাবাদ এবং বিভাজনের হুমকিকে প্রতিরোধ করবে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, জি-২০ সদস্যরা টেকসই পুনরুদ্ধার এবং শক্তিশালী, টেকসই, ভারসাম্যপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার জন্য ক্ষতিকারক প্রভাবগুলো প্রশমিত করতে ভালো-ক্যালিব্রেটেড, সুপরিকল্পিত এবং সু-যোগাযোগপূর্ণ নীতিগুলোর প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়ে, জি-২০ দেশগুলো আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব রক্ষা করতে এবং নেতিবাচক ঝুঁকি এবং নেতিবাচক স্পিলওভারের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য ম্যাক্রো-পলিসি সহযোগিতার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস সম্প্রতি সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গ্রাহকদের এবং ব্যবসায়াীদের সতর্ক করে ছুটির মৌসুমে নগদ অর্থ খরচ করে বড় কেনাকাটা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন যেহেতু অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত যাতে মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং আর্থিক কড়াকড়ি কমানো যায়, অন্যান্য নীতিনির্ধারকদেরও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে, বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাক্রো-প্রুডেন্সিয়াল রেগুলেশন জোরদার করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে জোর প্রচেষ্টা চালানো উচিত। আর্থিক নীতির উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে আর্থিক সহায়তা ব্যবস্থা প্রত্যাহারের জন্য সতর্কতার সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একটি আস্থাশীল মধ্যমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা এবং অরক্ষিত পরিবারগুলোকে নির্ধারিত ত্রাণ দিতে হবে। সরবরাহ ব্যবস্থার লক্ষ্য হতে হবে শ্রম-বাজারের সীমাবদ্ধতা কমানো, শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বাস্তুচুত শ্রমিকদের পুনঃবণ্টন এবং দাম বৃদ্ধির চাপ কমানো। খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধিতে কার্যকর নীতি সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হবে। এনার্জি সেক্টরের জন্য, নীতিগুলোকে কম-কার্বন শক্তির উৎসে রূপান্তরিত করতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় এনার্জির ব্যবহার কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
যদিও বাংলাদেশ মন্দায় নাও পড়তে পারে। তবে রপ্তানি পণ্য ও ঝুড়িকে বহুমুখীকরণ, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, সরকারি খাতের ব্যয়কে সুবিন্যস্ত করা ও মেগা অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রকল্পের যৌক্তিককরণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া হলে দেশটি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্দার নানান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আইসিসিবির ত্রৈমাসিক বুলেটিন সম্পাদকীয়