নিজস্ব প্রতিবেদক: আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। এই জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল। আবার উচ্চ দামে এলএনজি আমদানির কারণে ভর্তুকি বাড়ছে। এর ভর্তুকি কমাতে গ্যাসের দাম বাড়াতে হচ্ছে বারবার। তাই গ্যাসের নিয়ন্ত্রণে এলএনজির নির্ভরতা কমানো উচিত।
এর পরিবর্তে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহে জোর দেয়া উচিত। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের আয়োজিত (সিপিডি) ওয়েবিনারে এমনটি মন্তব্য করেন বক্তারা। গতকাল ‘জ্বালানি সরবরাহে গ্যাস-এলএনজি বিতর্ক: বিদ্যুৎ খাতে এলএনজি আমদানির ব্যয়জনিত প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক ওয়েবিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে গবেষণা প্রবন্ধটি যৌথভাবে উপস্থাপন করেন সিপিডি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী আবদুল্লাহ ফাহাদ।
প্রবন্ধে বলা হয়, গত (২০২০-২১) অর্থবছর প্রধান প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের উৎস ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। ৪৬ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি এসেছে এ উৎস থেকে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রই ছিল ৫২ শতাংশ। বর্তমানে গ্যাসের নিশ্চিত (প্রুভেন) মজুদ রয়েছে ১০ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)। তবে এ মজুদ ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকবে। এতে ২০৩০ সালে গ্যাসে মজুদ এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসবে। আর ২০৪১ সালে মজুদ শূন্যে পৌঁছাবে। আর গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকছে সরকার।
গত অর্থবছর প্রায় এক টিসিএফ গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই দেয়া হয়েছে ৪২৫ দশমিক ৭০ বিসিএফ (বিলিয়ন ঘনফুট)। এ ছাড়া শিল্প খাতে ১৮১ দশমিক ৭৫ বিসিএফ, ক্যাপটিভে ১৬৯, আবাসিকে ১৩৪ দশমিক ১৭, সারে ৬৪ দশমিক ৬৫, সিএনজিতে ৩৫, বাণিজ্যিকে ছয় ও চা-বাগানে এক বিসিএফ গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত অর্থবছর গ্যাসের চাহিদা ছিল চার হাজার ২২৪ এমএমএসসিএফডি (মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন)। আর সরবরাহ করা হয়েছে দুই হাজার ৬৩৯ এমএমএসসিএফডি গ্যাস। এতে ঘাটতি দাঁড়ায় এক হাজার ৫৮৫ এমএমএসসিএফডি গ্যাস। এর মধ্যে এলএনজি আমদানি করা হয় ৬৫০ এমএমএসসিএফডি। এরপরও ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে নিজস্ব গ্যাস পাওয়া না গেলে আগামীতে এ ঘাটতি আরও বাড়বে।
এদিকে গত অর্থবছর প্রতি ইউনিট (ঘনমিটার) এলএনজি আমদানিতে খরচ হয়েছে ৩১ টাকা ৫৩ পয়সা। অথচ বিদ্যুৎ খাতে প্রতি ইউনিট গ্যাস বিক্রি হয়েছে চার টাকা ৪৫ পয়সায়। এলএনজি আমদানির কারণে ২৭ টাকা বাড়তি খরচের বোঝা যুক্ত হয়েছে। চলতি (২০২১-২২) অর্থবছর এলএনজি আমদানিতে খরচ বাড়বে ৭২ শতাংশ। এতে গড়ে প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনতে হবে ৩৪ টাকা ৩৭ পয়সায়। এটি সরবরাহ পর্যন্ত পেট্রোবাংলার ইউনিটে খরচ পড়বে ৫০ টাকা ৩৯ পয়সা। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিতিশীলতার কারণে এ খরচ আবারও হ্রাস/বৃদ্ধি পেতে পারে।
যদিও উচ্চ দাম সত্ত্বেও এই মুহূর্তে এলএনজি আমদানি বন্ধ করা যাবে না বলে মনে করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান আবদুল জলিল। ওয়েবিনারে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সাশ্রয়ী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে চলমান সংকট উত্তরণ করতে হবে। সাম্প্রতিক গ্যাস কোম্পানিগুলোর দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের দাম শতভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো দিতেই পারে। কিন্তু আইন ও বিধি মেনে সবকিছু পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
বিইআরসির সদস্য মকবুল-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির আগ্রহ কমার কথা বলা হচ্ছে। অথচ তেল-গ্যাস সম্পর্কিত সব তথ্য তাদের দেয়া হচ্ছে না। যথাযথ তথ্য সরববরাহ করা হলে বিদেশি কোম্পানিগুলো আবারও এগিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, গ্যাসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি করে ক্যাপটিভে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিজেদের জ্বালানি না থাকলে অন্যদের ওপর নির্ভর করতেই হবে এবং বাজারের টালমাটাল পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ম তামিম বলেন, পেট্রোবাংলা জানে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে। কিন্তু অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়নি। বরং তারা আমদানিতে জোর দিয়েছে। এ ভুল পরিকল্পনা জ্বালানি খাতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কমার এ সংকট অবহেলাজনিত। সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে জোড় দিচ্ছে না। বরং আমদানির দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার বেশ অস্থিতিশীল। টাকা থাকলেও অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যায় না। তাই চাহিদা মেটাতে এলএনজি নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস আহরণ বৃদ্ধি ও অনুসন্ধানে জোড় দেয়া উচিত।
ওয়েবিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এতে আরও বক্তব্য রাখেনÑবাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান করিম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক রাজীব হায়দার প্রমুখ।