সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: করোনা সংকটের মাঝে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের অর্জন। গত বছরে দেশের ইতিহাসের রেকর্ড সংখ্যক কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডেলিং করে চট্টগ্রাম বন্দর। আর চলতি বছরে একের পর এক ইউরোপ, আমেরিকা ও চীনের বিভিন্ন বন্দরের সঙ্গে সরাসরি পণ্য পরিবহনে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। যার সংখ্যা বাড়ছে। এতে রপ্তানিকারকদের পণ্য পরিবহনে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় কম লাগবে। ফলে ব্যয়ও কমবে। এতে করে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশ এগিয়ে যাবে দেশের পোশাক খাত।
রপ্তানিকারক ও বন্দর-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া মোট ৭ লাখ ২৯ হাজার একক কনটেইনারের মধ্যে ৩ লাখ কনটেইনারই নেয়া হয়েছে ইউরোপে। এসব রপ্তানি পণ্য চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপ-আমেরিকামুখী রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার প্রথমে ছোট আকারের জাহাজে করে সিঙ্গাপুরের সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও তানজুং পেলাপাস বন্দরে নেয়া হয়। তারপর বুকিং পেলে ইউরোপ-আমেরিকামুখী বড় জাহাজে পণ্য তুলে দেয়া হয়। এতে রপ্তানিকারকদের পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগে ৪০ থেকে ৪৫ দিন। আর প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অর্থ ব্যয় বেশি হয়।
চলতি বছরের ফেব্রæয়ারির প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম থেকে ইতালিতে সরাসরি রপ্তানি পণ্য পরিবহন সেবা চালু হয়। ছোট জাহাজে চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি ইউরোপে দীর্ঘ যাত্রার সেই সাফল্য দেখে নতুন জাহাজ চালু করতে চায় সুইজারল্যান্ডের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কমোডিটি সাপ্লাইজ এজি। তারা আগামী ১৫ মে চট্টগ্রাম থেকে স্পেন ও নেদারল্যান্ডসে রটারডেম বন্দরে সরাসরি কনটেইনারে পণ্য পরিবহনে তিনটি জাহাজ নামানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তিনটি নতুন জাহাজ নামানোর সুবাদে চট্টগ্রাম থেকে কম সময়ে ও কম খরচে ইউরোপে রপ্তানি পণ্য পরিবহন যেমন সহজ হবে, তেমনি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পোশাক খাত আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকরা।
পোশাক খাতের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৪৫ শতাংশই রপ্তানি হয় ইউরোপের ২৭টি দেশে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে এসব দেশে ১ হাজার ৭৪৬ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। তবে করোনার সময় ভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ইতালিতে ছোট জাহাজ দিয়েই সরাসরি কনটেইনার পরিবহনসেবা চালু করে সেই দেশের রিফ লাইন ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ক্যালিপসো কোম্পানিয়া ডি নেভিগেশন। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা সহসা ঠিক হবে না ভেবে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সরাসরি কনটেইনারে পণ্য পরিবহনসেবা চালু করতে এগিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি দুটি জাহাজে এ পর্যন্ত পাঁচবার আমদানি-রপ্তানি পণ্য আনা-নেয়া করেছে। এতে সময় লেগেছে ১৮ থেকে ২০ দিন। এমন সাফল্য দেখে সুইজারল্যান্ডের কমোডিটি সাপ্লাইজ ইউরোপের স্পেন ও নেদারল্যান্ডে নতুন সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা পোশাক শিল্পের জন্য বড় একটি ইতিবাচক সংবাদ।
আর শিপিং এজেন্ট প্রতিনিধিরা বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপ-আমেরিকামুখী রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার প্রথমে ছোট আকারের জাহাজে করে সিঙ্গাপুরের সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও তানজুং পেলাপাস বন্দরে নেয়া হয়। এই চারটি বন্দরে নামানোর পর বুকিং পেলে ইউরোপ-আমেরিকামুখী বড় জাহাজে তুলে দেয়া হয়। এভাবে চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর অথবা মালয়েশিয়ার বন্দর ঘুরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কনটেইনার জাহাজে পণ্য পরিবহনে সাধারণত সময় লাগে ২৪ থেকে ২৮ দিন। তবে করোনার পর থেকে সিঙ্গাপুর বা শ্রীলঙ্কায় বড় জাহাজে বুকিং পেতে দেরি হওয়ায় এখন পণ্য পাঠাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৩৫ দিনের বেশি লেগে যায়। এমন অবস্থায় ইউরোপের শিপিং লাইনসগুলো এগিয়ে আসা আমাদের দেশের জন্য উপকার হয়েছে। এখন আগের চেয়ে কম টাকায় ও কম সময়ে পণ্য রপ্তানি করা যাবে। এছাড়া দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে তখন বড় জাহাজ চলবে, তখন একসঙ্গে ২০ হাজার কনটেইনার পাঠানো যাবে। আসলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, তা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডরিয়াল এম শাহজাহান বলেন, চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের দেশ ইতালির সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হয়। প্রথম দিকে স্বল্প পরিসরে শুরু হলেও এখন আরও ব্যাপক আকারের শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপের স্পেন ও নেদারল্যান্ডের সঙ্গে আগামী মাসে জাহাজ চলাচল শুরু হবে। এতে ব্যবসায়ীদের আগের চেয়ে ১০-১৫ দিন কম সময় লাগবে। আর ব্যবসায় কম সময় মানে তো ব্যয় কম হওয়া। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপ দেশগুলোর পাশাপাশি আমেরিকা, দুবাই, চীনের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চলাচলে বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে। সুতরাং আরও সুখবর আসবে। এছাড়া মাতারবাড়ি বন্দর চালু হলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সরাসরি বড় জাহাজ আসবে। কারণ এ বন্দর চ্যানেলের গভীরতা ১৬ মিটারের বেশি হবে। আর এ বন্দর হবে এশিয়ার সাব রিজিওয়াল পোর্ট। কারণ এ গভীরতা আশপাশের দেশগুলোর নেই।




