প্রতিনিধি, রাজশাহী: পদ্মার কোলঘেঁষা রাজশাহীর চরাঞ্চলগুলোতে শীতের আগমনে শুরু হয়েছে রবিশস্য চাষের উৎসব। প্রকৃতির দান আর উর্বর মাটির আশীর্বাদকে কাজে লাগিয়ে সরিষা, গম, মসুর, আলু, পেঁয়াজ-রসুন, ধান, গম, ভুট্টা, মটরশুঁটি, রসুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, টমেটো ও শিমসহ নানা ফসলের চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন চাষিরা। সকালের প্রথম আলো থেকে সন্ধ্যার শেষ রোদ পর্যন্ত মাঠজুড়ে চলছে হালচাষ, বীজ বপন, এবং চারা রোপণের কর্মযজ্ঞ।
এ অঞ্চলের মাটি যেমন উর্বর, তেমনি চাষাবাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ কৃষকদের দিয়েছে নতুন আশা। নদীর কোলজুড়ে প্রসারিত এই চরের মাটিতে উৎপাদিত রবিশস্য শুধু কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থাই উন্নত করে না, বরং যোগান দেয় জাতীয় খাদ্য ভা্লারে। নদীর বুকে জেগে ওঠা চর পলিমাটি মিশ্রিত উর্বর আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের কৃষি মৌসুমকে আবহাওয়া ও ঋতুর উপর ভিত্তি করে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে রবি মৌসুম, খরিপ-১, এবং খরিপ-২ মৌসুম। এর মধ্যে রবি মৌসুম শুরু হয় ১৬ অক্টোবর থেকে এবং চলে ১৫ মার্চ পর্যন্ত, যা কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত বিস্তৃত।
জানা যায়, রাজশাহীর চরাঞ্চলের ১১টি ব্লকে মোট ১৪ হাজার ৪৪ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৯৪৮ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসল আবাদ হয়ে থাকে, আর মাত্র ১৫ হেক্টর জমি পতিত রয়েছে। এই চরাঞ্চলে জমির ব্যবহারও বেশ বৈচিত্র্যময়। বছরে এক ফসল আবাদ হয় ২ হাজার ৭৯ হেক্টর জমিতে। দুই ফসলের চাষাবাদ হয় ৪ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে, আর ১ হাজার ৮১৯ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত হয় তিনটি ফসল।
চাষিরা বলছেন, রবিশস্য চাষে তাদের জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। রবি মৌসুমে সঠিক সময়ে বীজ বপন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে ভালো ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব। এই সময়টাতে আবহাওয়া যেমন সহনীয়, তেমনি জমির আর্দ্রতা এবং উর্বরতাও থাকে চাষাবাদের জন্য অনুকূল। চরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, সরিষা, গম, মসুর, আলুসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদে তারা উন্নত মানের বীজ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। সেচ সুবিধা এবং সময়মতো সার-কীটনাশক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এ মৌসুমের ফসল তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে কিছু চাষি শঙ্কার কথাও তুলে ধরেন। তাদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অনিয়মিত আবহাওয়া ফলনে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং সঠিক সময় ফসল বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
চরের পলিমাটির সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, সার কম লাগে। তবে পানির সমস্যা সমাধানে নদী থেকে তেলা হচ্ছে। তাদের জন্য সুবিধাজনক হবে। এতে অর্থনীতি আরও চাঙা হবে। এখানে যোগাযোগের ব্যবস্থাও বেশ ভালো। আবাদ তোলার সময় সবরকমের পরিবহন সুবিধা পাওয়া যাবে। রাজশাহীর দরগাপাড়া এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, নদীতে চর পড়ে যাওয়ায় এবার রবিশস্য চাষ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, এ বছর প্রায় সব কৃষকই রবিশস্য চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নদীর পানি নেমে যাওয়ায় শ্যালোমেশিন বসিয়ে সেচ দিয়ে বীজ রোপণ করতে হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো চর সবুজ ফসলে ভরে উঠবে।
পদ্মার চরে সরিষা ও পেঁয়াজের আবাদ করেছেন নগরীর দরগাপাড়া এলাকার আরেক কৃষক মো. সোহেল রানা। তিনি জানান, চরের এ জায়গাটি নগরীর বিনোদনকেন্দ্র হওয়ায় সাধারণ মানুষের আনাগোনা বেশি। অনেক সময় জমির ভেতরে প্রবেশ করে ফসলের ক্ষতি করে। তবে আমরা এই সমস্যা মোকাবিলায় বিকল্প পথ খুঁজছি। দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার চরে ফসল চাষ করে আসছেন নগরীর হোসেনীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে কালাই ও খেসারির চাষ করতাম। সেগুলোতে খুব বেশি লাভ হতো না। তাই এবার বাধাকপি, ফুলকপি, সরিষা, বেগুন, গম এবং ভুট্টা চাষ করেছি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এসব ফসল ঘরে তোলা শুরু হবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে এবছর ভালো লাভের আশা করছি।
পাঠানপাড়া এলাকার কৃষক মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, এই চর মূলত ইজারা নিয়ে চাষ করতে হয়। এখানে নানা ধরনের ফসল ফলানো সম্ভব। আমি এ বছর আখ চাষ করছি। আখ ছাড়াও লাউ, টমেটো, এবং শিমের চাষ করেছি। রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা এগুলো কিনে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে নগরবাসী টাটকা সবজি খেতে পারছেন।
রাজশাহী জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক উম্মে সালমা বলেন, আগে পদ্মার চরে হাতে গোনা কয়েকটি ফসল চাষ হতো। এখন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পদ্মার জেগে ওঠা চরে বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় কৃষকেরা বেশি লাভবান হচ্ছেন।
