Print Date & Time : 22 April 2026 Wednesday 4:37 am

চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বিশেষজ্ঞ ভাবনা

খোলা বাজারের এত ডলার যাচ্ছে কোথায়?

. জাহিদ হোসেন

সরকার বলছে, স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার জন্য পর্যাপ্ত রিজার্ভে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রতিদিন এক থেকে দেড়শ মিলিয়ন ডলার বাজারে ছাড়ছে, সেই ডলার যাচ্ছে কোথায়? অর্থবছরের প্রথম তিন মাস ২০ দিনের মধ্যেই ৪৬০ কোটি ডলার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে দেয়া হলো কিসের জন্য? এ ডলার তারা কোন কাজে লাগিয়েছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। অথচ গত অর্থবছরের পুরো সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক খোলা বাজারে বিক্রি করেছিল মাত্র ৭০৭ কোটি ডলার। এবার

 চার মাসেরও কম সময়ে বিক্রি করা হয়েছে গত বছরের পুরো সময়ের ৬০ শতাংশের ওপরে।

আমদানির যে বড় খাতগুলো আছে, সেগুলো সবারই জানা। তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রে সুতা, তুলা, এক্সেসরিজ এগুলোর ক্ষেত্রে তো ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে তাদের আয় থেকেই অর্থ পরিশোধ হয়ে যায়। সেখানে তো বাজার থেকে ডলার কেনার প্রয়োজন হয় না। বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রে খোলা বাজার থেকে ডলার কেনার দরকার হয়। কিন্তু সেখানে তো এলসি মার্জিন বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া শুল্ক-কর বাড়িয়ে আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কাজেই সেখানে তেমন ডলার প্রয়োজন হচ্ছে না। যে পরিমাণ ডলার বাজারে ছাড়া হয়ে, তা যদি সার, ডিজেল বা গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে ব্যয় হতো, তাহলে তো বিদ্যুতের এই পরিস্থিতি হতো না। তাহলে এসব ডলার যাচ্ছে কোথায়? সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ডলার সংকটের যে কথা বলছেন, তার সঙ্গে বাস্তবতা মিলছে না।

আমার মনে হয়, যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেগুলো মূলত অ্যাডহক ভিত্তিতে নেয়া হচ্ছে। কোনো সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না। একজন কর্মকর্তার একটি বিষয় মাথায় এলো, সেটি তারা বাস্তবায়ন শুরু করলেন। যে সংস্থার যে কাজ, তারা সেটি না করে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক এখন চিনির সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হলো মুদ্রানীতি প্রণয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু এগুলোর চেয়ে চিনি বা রপ্তানি বহুমুখীকরণের মতো বিষয়ে তারা বেশি ব্যস্ত।

বৈদেশিক বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় আমাদের একটি বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছে। সেটার কারণে রেমিট্যান্সে একটা ধস নেমেছে। কাজেই বৈদেশিক মুদ্রার সংকট যদি কাটিয়ে ওঠা না যায়, তাহলে আইএমএফ থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার পেলেও সেটা মাত্র তিন মাসেই খরচ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে যদি নীতির সংস্কার না করা হয়, তাহলে সংকট কাটবে না।

আমাদের রিজার্ভের দুটি প্রধান খাত হচ্ছে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়। বর্তমান বিনিময় হারের মাধ্যমে এ দুটি বিষয়কেই নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। একেক ক্ষেত্রে একেক ধরনের বিনিময় হার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ ছয় মাস আগেও একটি একক বিনিময় হার ছিল। স্থিতিশীলতার জন্য একক বিনিময় হার নিশ্চিত করা জরুরি।

রিজার্ভের যে হিসাব দেয়া হচ্ছে, তা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে নেই। দুদিন আগে নেট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ (এনআইআর) ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার। আগামী মাসে দুই বিলিয়ন ডলারের ওপরে আকু পেমেন্ট দিতে হবে। সেটার পাশাপাশি ইডিএফ ও আইডিএফ তহবিলসহ অন্যান্য খাতে রিজার্ভ থেকে যে অর্থ দেয়া হয়েছে, তা যদি বাদ দেয়া হয় তাহলে রিজার্ভ ২১ থেকে ২২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে।

সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে

. আহসান এইচ মনসুর

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতিতে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে কোনো নেতৃত্ব নেই। দেশের অর্থমন্ত্রী কোথায়? এসব সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব হচ্ছে অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের। পৃথিবীর সব দেশে তা-ই হয়। অর্থমন্ত্রী যদি সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিতে না চান, তাহলে তার পদে থাকার কী দরকার? অর্থনীতির বিষয়ে কথা বলার জন্য সরকারের একজন নেতা থাকবেন এবং তিনিই সরকারের মুখপাত্র হিসেবে সার্বিক বিষয়ে কথা বলবেন।

 কিন্তু এখন একেক স্থান থেকে একেকজন কথা বলছেন। তাছাড়া বর্তমানের সংকটটা যে কী, আর সে সংকট কতটা গভীর, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলছেন না এবং কীভাবে সেই সংকট মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু বলছেন না। সমাধান হতে হবে সামষ্টিক।

এই মুহূর্তে বড় বিষয় হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রিজার্ভ কমতে না দেয়া। আর রিজার্ভ ধরে রাখাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে আইএমএফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কিন্তু সেখানেও নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে কে দরকষাকষি করবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বা অর্থ সচিবের দায়িত্ব এটা নয়। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমরা সেই নেতৃত্বের ঘাটতি লক্ষ করছি।

এখন বিদ্যুতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। আদানি থেকে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানানো হচ্ছে। এখন তাদের অনুরোধ করে সেটা তো এক মাস এগিয়ে আনাও সম্ভব। এছাড়া পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন হলেও সেখানে সঞ্চালন লাইন না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুতের জন্য বাড়তি মূল্য পরিশোধের জন্যও প্রস্তুত। কাজেই তাদের উৎপাদন ঠিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

তবে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার তেমন সুযোগ নেই। কারণ দেশে খাদ্যশস্যের যে চাহিদা রয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন হয়। বাকি পাঁচ শতাংশ আমদানি করার সক্ষমতা বাংলাদেশের সবসময়ই ছিল এবং এখনও আছে। কাজেই দুর্ভিক্ষের বিষয়ে এত বেশি বক্তব্য কেন দেয়া হচ্ছে, তা আমার বোধগম্য নয়।

সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যে সমন্বয় নেই

. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

সরকারের ভেতরে সমন্বয় বলে কিছু নেই, যে কারণে সমস্যার যে রূপ, তার চেয়ে অনেকে অনেক বাড়িয়ে কথা বলছেন; একের দোষ অন্যের ওপর দিচ্ছেন। সমস্যাগুলোর বিষয়ে সরকারের কেউ কেউ আছেন অস্বীকার করার মনোভাব নিয়ে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে কোনো সমস্যাই নেই। আবার কেউ কেউ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের খরা দেখা দেবে, এমন কথাও বলছেন। কিন্তু কেউ সমন্বিতভাবে এগুলো মোকাবিলা করার জন্য যে মধ্যমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন, সে

বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ বিষয়ে আমি বারংবার বলেছি যে, দুই বছর বা তিন বছর মেয়াদি একটি মধ্যমেয়াদি উত্তরণকালীন পরিকল্পনা দরকার। বর্তমান বাস্তবাতায় বাজেটের কাঠামোর কোনো কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। সেজন্য একটি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আর এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী তো অদৃশ্য অবস্থায় আছেন।

এ মুহূর্তে আমি নীতি-নেতৃত্বের শূন্যতা ও সমন্বয়ের চরম ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি। কোনো ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না, কেবল হাহুতাশ শুনতে পাচ্ছি। একেক জনের একেক ধরনের বক্তব্যের জন্য সরকার ও বাজার ব্যবস্থা উভয় ক্ষেত্রে আস্থাহীনতা দেখা দিচ্ছে। এই আস্থাহীনতা চলতে থাকলে সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাবে এবং বিদেশ থেকে আসার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ে, যারা বাজার নিয়ে কারসাজি করে তারা সুযোগ পায় এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।