সবুজ চা বাগানের মাঝে চা শ্রমিকদের পাতা তোলার দৃশ্য অনেকটা নান্দনিক। এই দৃশ্য দেখলে আমাদের মনে তৃপ্তি আসে, ভালো লাগা কাজ করে। কিন্তু এই নান্দনিক দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে রোদ-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি। আর এই হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে মিলে পরিবারের আহার। যদিও চা শ্রমিকদের এই হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে যে খাবার জোটে, তার কথা শুনলেই আপনি-আমি বলে উঠবÑএভাবেও মানুষ বেঁচে আছে ডিজিটাল বাংলাদেশে!
চা শ্রমিকদের প্রতিদিনকার খাদ্যে রয়েছেÑসকালবেলা রুটি আর চা বা আলুভাজি; দুপুরে রুটির সঙ্গে আলুসিদ্ধ, পেঁয়াজ ও কচি চা পাতার মিশ্রণে ভর্তা এবং ঠাণ্ডা চা। রাতে ভাত। ভাতের সঙ্গে চানার ডাল বা অন্যকিছু। ভাবুন তো এগুলো দিয়ে আপনার একটা দিন পাড়ি দেয়ার কথা। সম্ভব কি? সম্ভব নয়। কিন্তু তবুও তারা এই খাবারগুলো খেয়েই বেঁচে আছে। কারণ কী? কারণ একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১২০ টাকা। ১২০ টাকায় একজন কর্তা তার পরিবারের জন্য আর কী খাবার জোগাড় করতে পারবে, বলেন? তাই তারা ওপরের খাবারগুলোই খেয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের গান শোনে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে, এই ১২০ টাকায় কি একটি পরিবার চালানো সম্ভব? এক ডজন ডিমের দাম বর্তমানে ১৬০ টাকা। সেখানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা!
চা শ্রমিকদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় মাছ, মাংস ও ডিম নেই। কারণ কিন্তু ওই ১২০ টাকা। খাবার তালিকায় মাছ, মাংস ও ডিম না থাকায় তারা অপুষ্টিহীনতায় ভোগে। ভাবুন একটা পরিবারের সদস্য যদি চারজন হয়, তাহলে ওই পরিবারের কর্তার আয় ১২০ টাকা, অর্থাৎ মাসে তিন হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু চার সদস্যের জন্য এক বেলার ভাত রান্না করলেও প্রায় এক কেজি চাল লাগবে। আর মাসে শেষে চাল লাগবে ৩০ কেজি, যার দামে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ১০০ টাকা। তাহলে ডাল, সবজি, পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচ কেনার টাকা থাকল কোথায়! এ তো গেল শুধু খাবারের হিসাব, এরপর চিকিৎসা আছে, যাতায়ত ভাড়া আছে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ আছে। এতকিছু কি ওই ১২০ টাকার মধ্যে চালানো সম্ভব? সম্ভব নয় অন্তত বর্তমান প্রেক্ষাপটে। আন্দোলনরত এক শ্রমিক সাংবাদিককে জানিয়েছেন, তারা মাছ-মাংস তখনই খেতে পারেন, যখন তারা কোনো বিশেষ দিনের বোনাস পান। মানে দাঁড়াল তাদের পরিবারের সদস্যদের মুখে মাছ-মাংস তুলে দিতে একজন শ্রমিককে অধীর আগ্রহে থাকতে হয়Ñকবে কোন বিশেষ দিনের বোনাস তারা পাবেন!
আর এই যে এতক্ষণ ‘১২০ টাকা, ১২০ টাকা’ বলে আসছি। সেখানেও ভাগ রয়েছে। দিনে যদি ২৪-২৫ কেজি চা পাতা তুলতে পারে, তবেই মিলবে ১২০ টাকা; না পারলে হিসাব হবে আলাদা। এগুলো কি আসলেই মেনে নেয়ার মতো? বর্তমানে সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী। এখন এক কাপ চায়ের দামও ১৫ টাকা হয়ে গেছে। কাজেই আর বোঝার বাকি নেই যে, চা শ্রমিকদের পেটে টান পড়ছে। তাই তারা আজ আন্দোলনে। তাদের দাবি দৈনিক মজুরি ১২০ থেকে ৩০০ টাকা করে দেয়া। আমার মতে, এটাও একজন চা শ্রমিকের নায্য মজুরি নয়। বর্তমানে দৈনিক ৫০০ টাকা আয় করা লোকটিও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, আর সেখানে ৩০০ টাকা তো কমই। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন থাকবেÑচা শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনির যথাযথ মূল্যায়ন ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাদের দাবি মেনে নেয়া হোক। সেইসঙ্গে তাদের দাবির মজুরি ৩০০ টাকা নয়, বরং ৫০০ টাকা করার জোর অনুরোধ রইল; কারণ তাদের দাবি কিংবা আন্দোলন অযৌক্তিক নয়।
লাইজু আক্তার
শিক্ষার্থী, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ