চা-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের উদ্যোগ নিন

চা-শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। জাতীয় অর্থনীতিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশের চা উৎপাদনের পরিমাণ বছরে ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজি এবং এখান থেকে চা রপ্তানি করা হয় ২৫টি দেশে। এই চা উৎপাদনের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত তারাই চা-শ্রমিক। কিন্তু চা-শ্রমিকরা সব নাগরিক সুবিধা ভোগের অধিকার সমভাবে প্রাপ্য হলেও তারা পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার; এটি কমবেশি সবার জানা। অবহেলিত ও অনগ্রসর এ জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, তাদের সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিতকরণ এবং পারিবারিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ‘চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম’ গ্রহণ করেছে। কিন্তু তা কতটা অপ্রতুল একটি তথ্যেই অনুধাবন করা যায়। আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, আপৎকালীন চা-শ্রমিকদের পাঁচ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা দেয়া হয়। এতে নাকি পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। সহায়তা পেতে প্রার্থীর বার্ষিক গড় আয় অনূর্ধ্ব ৪৮ হাজার টাকা হতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চা-শ্রমিকের গড় আয় ৪৮ হাজার টাকার বেশি হলে বর্তমান নিত্যপণ্যের দুর্মূল্যের সময় তা কি পর্যাপ্ত?

চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারাদেশের ২৩১টি চা-বাগানে গতকাল শনিবার থেকে ধর্মঘট পালন করছে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়ন। চা-বাগানের সব কাজ বন্ধ রেখে দাবি আদায়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কে অবস্থান নেয়ার জন্য প্রতিটি চা-বাগানের শ্রমিকদের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে আসছেন শ্রমিকেরা।

আমরা মনে করি, আন্দোলনের আগে বাগানমালিকদের উচিত ছিল খোঁজখবর নিয়ে শ্রমিকদের যৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া। এখন শ্রমিক ধর্মঘটে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চা-শ্রমিকরা অন্য খাতের শ্রমিকদের চেয়ে বঞ্চিত। দুই বছর আগে যে জিনিস ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটা ২০০ টাকায় কিনতে হয়। অথচ বেতন বেড়েছে অনেক কম।

জানা গেছে, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার জন্য চা-শ্রমিকরা দুই বছর আগে থেকে দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু মালিকপক্ষ মাত্র ১৪ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির বাজারে বেতন মাত্র ১৪ টাকা বাড়ানো কতটা ন্যায্য, তা মালিকদের ভাবতে হবে।

নিরাপদ পানি ও পয়োব্যবস্থাসহ অন্য নাগরিক সুবিধায় চা-শ্রমিকেরা সমাজের মূলধারার চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে। মজুরি কম বলে বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠীর জীবনমানও অনুন্নত। রোগব্যাধি নিয়েও তারা কাজ করেন। অথচ চা-শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন না। তাদের বাদ রেখে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি আছে, কিছু কাজও হচ্ছে।

অনগ্রসর চা-শ্রমিকদের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা ও নির্দেশনা জরুরি। চা-বাগান মালিকপক্ষ, চা-শ্রমিক ইউনিয়ন, স্থানীয় পঞ্চায়েত চা বোর্ড, বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ চা শ্রমিকদের দুর্দশা লাঘবে বড় ভূমিকা রাখবে। দারিদ্র্যের বৃত্তে আটকে আছে চা-শ্রমিকদের জীবন। তাদের ৫১ শতাংশই নারী। পোষ্য আছে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ।  এই শ্রমমির্ভর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাদানে অংশীজনরা একসঙ্গে কাজ করলে অবহেলিত শ্রমিকরা উপকৃত হবে।