শেখ রফিকউজ্জামান: চা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্রমাগত নগরায়ণের ফলে চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রাম থেকে শহর, নি¤œবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সবারই এখন আর চা ছাড়া চলে না। একেবারে প্রথম চা-গাছ রোপণের সময় থেকে ধরলে বাংলাদেশের চা শিল্পের বয়স ১৭৮ বছর। ১৮২৮ সালে প্রথম চা বাগান করার উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে প্রথম বাণিজ্যিক আবাদ শুরু হয় সিলেটে ১৮৫৪ সালে। চা উৎপাদন শুধু সিলেটেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৮৬০ সালে হবিগঞ্জের লালচাঁন্দ চা বাগান ও মৌলভীবাজারের মির্তিঙ্গা চা বাগানে চায়ের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। ২০০০ সালে উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়েও ছোট আঙ্গিকে চায়ের চাষ শুরু হয়। ২০০৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামেও শুরু হয় চায়ের চাষ। বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৫৭-৫৮ সময়কালে তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সময়ে চা শিল্পে মাঠ ও কারখানা উন্নয়ন এবং শ্রম কল্যাণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
২০২১ সালে দেশের ১৬৭টি চা বাগান এবং ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান থেকে রেকর্ড পরিমাণ মোট ৯ কোটি ৫ লাখ ৬ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যা ২০২০ সালের চেয়ে ১ কোটি ১ লাখ ১১ হাজার কেজি বেশি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এখন প্রতি বছর আনুমানিক ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন কেজি চা বিদেশে রপ্তানি হয়। কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাজ্য, আফগানিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, কুয়েত, ওমান, সুদান, সুইজারল্যান্ডসহ অনেকগুলো দেশে রপ্তানি হয় বাংলাদেশের চা। কোভিড মহামারি পরিস্থিতিতেও দেশের সব চা বাগানের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। ফলে ২০২১ সালে দেশের চা উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের চা খাওয়ার অভ্যাস বাড়লেও চা শ্রমিক ভাইবোনদের জীবনমান এখনও বৃদ্ধি পায়নি। চা শ্রমিকরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন, দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতে জর্জরিত। সারাদিন হাড়ভাঙা কঠোর পরিশ্রমের পরে দিন শেষে একজন চা শ্রমিক ১২০ টাকার বেশি মজুরি পান না। ভাবতেও অবাক লাগে ২০২২ সালে এসেও একজন শ্রমিকের সংসার দৈনিক ১২০ টাকা দিয়ে কীভাবে চলে? কয়েক বছর আগে তো এর থেকে আরও কম দেয়া হতো। চা শ্রমিকদের ২০০৭ সালে মজুরি ছিল ৩২ টাকা। ২০০৯ সালে ১৬ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ৪৮ টাকা। ২০১৩ সালে বাড়ানো হয় ৬৯ টাকা, আর এখন ১২০ টাকা। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি প্রতিদিন যেন তাদের ২৫০-৩০০ টাকা পারিশ্রামিক দেয়া হয়। বর্তমানে উৎসব ভাতা বেড়েছে। বৃদ্ধ চা শ্রমিকদের সমাজসেবা মন্ত্রণালয় থেকে বছরে মাত্র ৫ হাজার টাকার খাদ্যসামগ্রী দেয়া হচ্ছে। সেটাও চা শ্রমিকরা অনেক আন্দোলন করে আদায় করেছেন। পৃথিবীর আর কোথাও শ্রমের এত কম মূল্য দেয়া হয় কি না তা আমার জানা নেই।
একজন শ্রমিকের সারাদিনের খাবার বলতে লাল চা আর শুকনো রুটি। যে নারী শ্রমিকরা চা বাগানে কাজে যান তারা সবাই কিছু খাবার নিয়ে যান। দুপুরের সময় নারী শ্রমিকরা দলবেঁধে বাগানের ভেতরে খাবারের জন্য বসে পড়েন। এ খাবারের মধ্যে রয়েছে কচি কুঁড়ি চা পাতা, আলু, কাঁচা মরিচ ও মুড়ি। যেখানে দিনপ্রতি ১২০ টাকা মজুরি সেখানে শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্য কিংবা সন্তানদের উন্নত শিক্ষার কথা ভাবা নিতান্তই অবান্তর। চা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাগান কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সংখ্যা ১১৮টি। স্কুলগুলোতে ২৫ হাজার ৯৬৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন মাত্র ৩৬৬ জন শিক্ষক। আর এই শিক্ষকরা সাধারণত অষ্টম থেকে নবম শ্রেণি পাস। শ্রমিকদের কেউ যদি এসএসসি পাস করে থাকে তাহলে তাকে ‘বাবু’ বলা হয় এবং তাকে বাগানে চাকরি দেয়া হয়। তার বেতন আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যেই হয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ নেই। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ৩টি বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য একজন মাত্র এমবিবিএস চিকিৎসক ছিলেন। বর্তমানে ৬টি বাগানের জন্য একজন মাত্র এমবিবিএস চিকিৎসক আছেন।
২০১৯ সালে সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম জরিপটি চালায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। এই জরিপে দেখা গেছে, অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বাকার, ২৭ শতাংশ শীর্ণকায়। স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ৪৬ শতাংশ কিশোরীর, মা হয়ে যাচ্ছে ২২ শতাংশ। এছাড়া ন্যূনতম স্যানিটেশন-সুবিধা নেই চা বাগানের ৬৭ শতাংশ পরিবারের। শ্রমিকদের সংকট সন্তানদের শারীরিক গঠনেও প্রভাব ফেলছে। এর আগে ২০১৮ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) মৌলভীবাজারের চা-বাগানগুলোর নারীদের ওপর একটি গবেষণা চালায়। এতে দেখা যায়, প্রায় ১৫ শতাংশ নারী জরায়– ক্যানসারে ভুগছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বল্পমজুরি, ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার অভাব, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, শিক্ষার অভাব ও কুসংস্কারের কারণে এমন অপুষ্টি আর রোগের শিকার চা বাগানের নারী ও শিশুরা।
এছাড়া দেড় শ বছর একই জমিতে বসবাস করে এখন পর্যন্ত এক খণ্ড ভূমির অধিকার পায়নি এই শ্রমিকরা। চা শ্রমিকদের বসবাস খুবই অস্বাস্থ্যকর। চা বাগান কর্তৃপক্ষের দেয়া কুঁড়েঘরে চা শ্রমিকরা একত্রে বসবাস করেন। প্রতি বছর শ্রমিকদের গৃহ নির্মাণের জন্য চুক্তিপত্র থাকলেও সেটা বাস্তবে হয়ে ওঠে না। চা বাগান এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় চা শ্রমিকদের সন্তানরা অনেকেই শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের ১৬২টি চা বাগানের রেজিস্টার্ড শ্রমিকের সংখ্যা ৮৯ হাজার ৮১২ জন। এর বাইরে অস্থায়ী (ক্যাজুয়েল) শ্রমিক আছেন আরও ১৯ হাজার ৫৯২ জন। অস্থায়ী শ্রমিকরা রেশন ও প্রভিডেন্ড ফান্ড পান না। বসবাসের জন্য ১৬ হাজার পাকাঘর বরাদ্দ আছে রেজিস্টার্ড শ্রমিকদের জন্য। আর প্রায় ৪৫ হাজার শ্রমিকের জন্য রয়েছে কাঁচাঘর। রেজিস্টার্ড ও অস্থায়ী শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিকের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। শিক্ষায়ও পিছিয়ে রয়েছে এখানকার শিশুরা। বেশিরভাগ বাগানেই বিদ্যালয় নেই। আবার প্রাথমিকের পর শিক্ষার দায়িত্বও নেয় না বাগান কর্তৃপক্ষ। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য বাগানে স্বাস্থ্যসেবাও অপ্রতুল। বেশির ভাগ বাগানে নামমাত্র একটি চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও জটিল কোনো রোগ হলে নিজ খরচে বাইরে চিকিৎসা করাতে হয়।
প্রতি বছর চা শ্রমিকদের উৎপাদিত চা বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে এবং দেশের অভ্যন্তরে বিক্রি করে বাগান মালিকেরা হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করছেন। এই হাজার কোটি টাকা আয়ের সিকিভাগের অর্ধেকও চা শ্রমিকদের জন্য ব্যয় করা হয় না। সরকার যদি চা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় তাহলে অবশ্যই চা শ্রমিকদের শোষণের এই যাঁতাকল থেকে মুক্তি দিতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরিকাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। চা শ্রমিকদের বর্তমানে যে রেশন দেয়া হয় তার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। শ্রমিকদের সন্তানদের উন্নত ও উচ্চশিক্ষার পথ সুগম এবং মসৃণ করার জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার সেগুলো করতে হবে। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাগান মালিকদের বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারিভাবে চা বাগানগুলোতে নিয়মিত তদারকির বিষয়টি জোরদার করতে হবে যাতে কোনো অনিয়ম না হয় সেই লক্ষ্যে। যে যে বাগানগুলোতে শ্রমিক শোষিত হবে সেগুলোর জন্য অবশ্যই শাস্তির বিধান রাখতে হবে। চা শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার জন্য অবশ্যই একটি আলাদা বিশেষ এবং যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা বহুকাল ধরে নিরক্ষরতা, নিপীড়ন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে আসছে। দেশের মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। তারা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, খালি পায়ে, জোঁক, মশা, সাপসহ বিষাক্ত পোকাম কড়ের কামড় খেয়ে মাত্র ১২০ টাকার বিনিময়ে সকাল থেকে সন্ধ্যাঅবধি কাজ করে। চা শিল্প আমাদের একটি ঐতিহ্য ও গৌরবের বিষয়। এই শিল্প আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। তাই এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চা শ্রমিকদের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। চা শ্রমিকদের উন্নয়ন ব্যতিরেকে কোনোভাবেই চা শিল্পের ব্যাপক প্রসার সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়