মফিজ জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা: চুয়াডাঙ্গায় কৃষকদের মাঝে চারা পদ্ধতিতে তুলার চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদি ফসল হওয়ায় তুলার সাথে অন্য ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি বিভাগ। ফলে তুলার সাথে সাথী ফসল হিসাবে ডাল, পিঁয়াজ, রসুনসহ সবজি আবাদ করছেন কৃষকরা। চলতি বছর জেলায় ৪ হাজার ৩৩২ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদ করা হয়েছে। উল্লেখিত জমি থেকে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন তুলা ও বীজ উৎপাদন হবে বলে মনে করছে জেলার কৃষি বিভাগ। আর উৎপাদিত তুলার বাজার মূল্য হতে পারে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা।
দোআঁশ ও পলিযুক্ত মাটি এবং উচুঁ জমি তুলা চাষের জন্য উপযোগি। তুলা চাষে বিঘায় হাইব্রিড জাতের বীজ লাগে ৫শ-৬শ গ্রাম আর উফশি ওপি জাতের বীজ লাগে ১ কেজি। বীজ বপনের পূর্বে শুকনা মাটি অথবা ছাই দিয়ে ঘসে নিতে হয়। বীজ তলায় বীজ বপনের ১০-১২ দিন পর মূল জমিতে চারা বপন করতে হয় ১৫ জুন থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে। হাইব্রিড জাতের বীজ আগাম লাগাতে হয়। তুলার জমিতে জৈব্য সারের ব্যবহার বেশি। জমি ভাল ভাবে চাষ দিয়ে তৈরি করে নিতে হয়। প্রতি বিঘা জমিতে উচ্চ ফলনের জন্য প্রায় ৩ হাজার চারা রোপন করতে হয়। একটি তুলা গাছে ১শ-২শ ফল ধরে। কাঁচা অবস্থায় ফলের রঙ সবুজ দেখায়। শুধু পোকা-মাকড় দমনের জন্য কীটনাশক ব্যবহার হয়।

তুলা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় মাটির ব্যবস্থা থাকায় চুয়াডাঙ্গা জোনে বাণিজ্যিক ভাবে চাষ হচ্ছে তুলা। কারণ এখানকার মাটি উর্বর ও জমি অন্য এলাকার চেয়ে উচুঁ। বর্তমানে চারা পদ্ধতি ও উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের বীজ দিয়ে তুলা চাষ করছেন এখানকার কৃষকরা। তুলা ৬ মাসের ফসল হলেও লাভজনক ব্যবসা। সাথী ফসল ও চারা পদ্ধতি ব্যবহার হওয়ায় কৃষকরা অন্য ফসল চাষ না করে তুলা চাষে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উফশী ওপি জাত, দুটি কোম্পানির হাইব্রিড জাতের বীজ রয়েছে। এ মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জোনে ২৮৬টি স্থানে ৪ হাজার ৩৩২ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদ হচ্ছে। ২০২০ সালে চুয়াডাঙ্গা জোনে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে তুলার আবাদ হয়। এ বছর বেশি জমিতে তুলার চাষ হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত তুলার রঙ ও গুণগত মান ভাল হওয়ায় চাহিদা অনেক। এখানকার তুলার রঙ ধবধবে সাদা। বীজের গুণগত মান ভাল হওয়ায় তা সংরক্ষণ করা হয়।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্ভাবিত ১৯টি সমভূমির তুলার জাতের মধ্যে ১৮টি উচ্চ ফলনশীল ও একটি হাইব্রিড জাতের। বিদেশ থেকে দেশের দুটি কোম্পানি বীজ আমদানি করে থাকে হাইব্রিড জাতের। এ জাতের বীজ দিয়ে কৃষকরা তুলা চাষ করেন।

তুলা চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ৮-১০ হাজার টাকা খরচ হয়। ১৫-২০ মণ তুলা পাওয়া যায় বিঘায়। খরচ বাদে বিঘায় ৫১-৬৮ হাজার টাকা লাভ হয় কৃষকদের। প্রতি মণ তুলার বর্তমান বাজার দর ৩ হাজার ৪শ টাকা। তুলার দাম আর একটু বেশি হলে কৃষকরা লাভবান হবেন। কৃষকরা এ মৌসুম থেকে তুলার সাথে সাথী ফসল চাষ শুরু করেছেন। কারণ তুলা ৬ মাসের ফসল। তুলার দুই সারির মাঝ দিয়ে কৃষকরা পিয়াজ, রসুন, ঝালসহ বিভিন্ন ধরনের শীতকালিন সবজি চাষ করছেন। সাথী ফসল চাষ করায় বাড়তি লাভ হচ্ছে কৃষকদের।
চুয়াডাঙ্গা বেলগাছি গ্রামের তুলা চাষী ইয়ামিন আলি বলেন, ‘এ মৌসুমে ৫ বিঘা জমিতে তুলা চাষ করছি। তুলা চাষে বেশি সময় লাগলেও লাভজনক ও খরচ কম। তুলার পরিচর্যা কম। সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম। এক বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের তুলা চাষ করলে ১৫-১৭ মণ তুলা পাওয়া যায়।’
একই এলাকার তুলা চাষী মনজুর কাদির জানান, ‘সর্ব প্রথম তুলার সাথে সাথী ফসল পিঁয়াজ ও রসুন লাগিয়েছি। তুলা গাছ লম্বা ও সুন্দর হয়েছে। পিঁয়াজ ও রসুন খুব ভাল হয়েছে। তুলার সাথে পিঁয়াজ ও রসুন বিক্রি করে বাড়তি টাকা পাওয়া যাবে। ৭ বিঘা জমিতে তুলা চাষ রয়েছে।

আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়া গ্রামের তুলা চাষী ডিউক হুদা বলেন, ‘এ বছর প্রথম তুলা চাষ করছি। ভূট্টা, ধান চাষে খরচ বেশি হওয়ায় তুলা চাষ করছি হাইব্রিড জাতের। তুলা উন্নয়ন অফিস থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছি।’
চুয়াডাঙ্গা জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা শেখ আল মামুন বলেন, ‘উন্নত জাতের তুলা বীজ ব্যবহার করছি। চারা করে তুলার আবাদ হচ্ছে। ৮-১০ হাজার কৃষক তুলা চাষ করছে এ জোনে। এবার বৈরি আবহাওয়া কারণে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়। দেশের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ায় বেশি তুলা চাষ হচ্ছে। সিংহভাগ তুলার চাহিদা দুই জেলা থেকে মেটে।’
দেশের বাজারে তুলার চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে হাইব্রিড জাতের তুলা চাষ, চারা তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে দেশে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড।