জনসংখ্যা সমস্যা নয়; বরং সুশিক্ষিত, দক্ষ পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ। একটি দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবাই কর্মক্ষম নয়। আছে শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, বিশেষ শারীরিক চাহিদা সম্পন্ন মানুষ, এরা কাজ করতে অক্ষম। জনসংখ্যার বড় অংশ কর্মক্ষম হলেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে সবল হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন, যার মধ্যে ২৮ শতাংশ তরুণ। এদের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৪ লাখ। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে; সংখ্যায় যা ১০ কোটি ৫০ লাখ। মোট জনসংখ্যার মধ্যে তরুণদের এই বড় অংশ যে কোনো দেশের জন্য বড় সম্ভাবনা সুযোগ হিসেবে গণ্য হবে, যদি দেশের কর্মক্ষম সব নাগরিককে যথোপযুক্ত কাজ দেয়া যায়। বিশেষ করে প্রতি বছর কর্মবাজারে যোগ হওয়া তরুণদের যদি ঠিকমতো কাজে লাগানো যায়।
জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম, অর্থনীতির ভাষায় অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতির সুবিধা বলা হয়। গত শতকের ষাট ও নব্বইয়ের দশকে হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান জনমিতির সুবিধা নিয়ে বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে জনমিতির এ সুবিধা কাজে লাগানোর এখনই সময়। কেননা জনমিতির এ সুবিধা বেশি দিন থাকে না। গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। রোববার সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ‘চেঞ্জিং পপুলেশন ডায়নামিকস অব বাংলাদেশ অ্যান্ড পলিসি অ্যাকশনস টু রিয়ালাইজ দ্য ফাস্ট অ্যান্ড সেকেন্ড ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে উঠে এসেছে যে, ১২-১৩ বছরের মধ্যে দেশের জনমিতির সুবিধা শেষ হয়ে যাবে। বড়জোর ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে। তাই জনমিতির সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সেমিনারে অংশ নেয়া আলোচকরা। এ লক্ষ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানোসহ দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিশেষ নজর দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
জনমিতির সুবিধা কাজে লাগাতে হলে এখন থেকেই সর্বাত্মক প্রয়াস নেয়া উচিত। প্রথমেই বাজারব্যবস্থা সামনে রেখে দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সামনে রেখে তারুণ্যকে চাকরির বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যাও অনেক বেশি। অথচ বিপুলসংখ্যক তরুণকে কাজে লাগানো গেলে সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা অসম্ভব নয়। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের বড় অংশ শিক্ষিত; সম্মানজনক ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলেই তরুণরা দেশের জন্য কর্মনিষ্ঠা দিয়ে কাজ করতে পারবে। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। কাজ দিতে না পারলে তারা হতাশ হবে, বিপথে ধাবিত হবে। আমাদের শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশের ওপর অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। ফলে তাদের উৎপাদনশীলতার শক্তিকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং ভোগও বাড়ছে না। তাদের শোভন কাজের দিকে নিয়ে আসতে উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।