বিবিএসের প্রতিবেদন

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ফের ঊর্ধ্বমুখী!

মো. মাসুম বিল্লাহ: সাধারণত কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে মানুষ প্রজনন বিষয়ে সচেতন হতে থাকে। এর ফলে স্থূল জন্মহার বা টিএফআর এবং জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার কমে আসতে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। এখানে মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে প্রতিজন প্রজনন সক্ষম নারীর বিপরীতে সন্তান জন্মদানের হার সাতজন থেকে দুজনে নেমে আসে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে জš§ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সরকারের নানা উদ্যোগ ও প্রজনন স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সম্পৃক্ততা। কিন্তু হঠাৎ করে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে শিশুর জš§হার ও জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৮ সালে জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার (আরএনআই) ছিল এক দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা পরের বছর হ্রাস পেয়ে হয় এক দশমিক ৩২ শতাংশ। এর পরের দুই বছর ২০২০ ও ২০২১ সালে এ হার ছিল এক দশমিক ৩০ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালে এক লাফে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক ৪০ শতাংশে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের এই উল্লম্ফনকে অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২২ সালে কেবল জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধির হারই বাড়েনি, বরং প্রজনন সক্ষম ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রতি হাজার নারীর বিপরীতে শিশুর (পাঁচ বছরের কম বয়সী) সংখ্যাও বেড়ে গেছে। এ দুটি সূচক একটি অপরটির ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং একটির হার বৃদ্ধি পেলে অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বৃদ্ধি পাবে। প্রজনন সক্ষম প্রতি হাজার নারীর বিপরীতে শিশুর সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৮ সালে প্রতি হাজার প্রজনন সক্ষম নারীর বিপরীতে শিশুর অনুপাত ছিল ৩০৪ জন। পরের তিন বছর ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে এ অনুপাত ছিল ৩০২ জন করে। কিন্তু ২০২২ সালে এক লাফে প্রতি হাজার প্রজনন সক্ষম নারীর বিপরীতে শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ জনে।

মাত্র এক বছরের ব্যবধানে শিশুর সংখ্যা এত বেশি বেড়ে যাওয়ার কারণ কী হতে পারেÑএমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নানা কারণেই এমনটি হতে পারে। একটি কারণ থাকতে পারে উপাত্ত প্রস্তুত করার পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে। তবে বিবিএস এমন কিছু করেছে কি না আমার জানা নেই। আর আরেকটি কারণে হতে পারে, তা হচ্ছে জš§ নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার কমে গেলে।’ দ্বিতীয় কারণটিকেই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি সরকারি তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, বর্তমানে জš§ নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। মোট চাহিদার বিপরীতে এ ঘাটতির পরিমাণ ১০ শতাংশ। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে মানুষের মধ্যে অনীহাজনিত কারণেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জš§ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর নতুন করে গুরুত্বারোপের পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, জš§ নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না হলে অপূর্ণ চাহিদা বাড়বে। এতে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ, গর্ভপাত, মাতৃমৃত্যুÑসবই বাড়বে। সুতরাং দ্রুত জš§নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।

এদিকে জš§হার বৃদ্ধির ফলে ২০২২ সালে প্রতিজন প্রজনন সক্ষম নারীর বিপরীতে শিশুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন একজন প্রজনন সক্ষম নারীর বিপরীতে শিশুর সংখ্যা ছিল ৬ দশমিক ৯ জন। এরপর রাষ্ট্রীয় ও এনজিওগুলোর জোরালো পদক্ষেপের ফলে দ্রুততার সঙ্গে প্রজনন হার কমতে থাকে। স্বাধীনতার পর মাত্র ৩০ বছরে ২০০১ সালে একজন নারীর বিপরীতে শিশুর সংখ্যা নেমে আসে তিনজনে। আর ২০১৮ সালে এটি নেমে আসে দুই দশমিক শূন্য পাঁচজনে। ২০১৯ ও ২০২০ সালে এ হার ছিল দুই দশমিক শূন্য চারজন করে। ২০২১ সালে এটি ফের দুই দশমিক শূন্য পাঁচজন হয়। আর ২০২২ সালে এক লাফে এটি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে দুই দশমিক ২০ জন। আর এ বৃদ্ধির অনুপাত গ্রামাঞ্চলে মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও শহরাঞ্চলে বেড়েছে ব্যাপক হারে। আর এক বছরে জন্মহার এতটা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব জনসংখ্যা পিরামিডেও লক্ষ করা গেছে। এর ফলে পিরামিডের প্রথম ধাপ শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার অনুপাত মোট জনসংখ্যার মধ্যে এক শতাংশীয় পয়েন্ট হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে এই বয়সী শিশুর অনুপাত মোট জনসংখ্যার মধ্যে ছিল ২৭ দশমিক সাত শতাংশ, যা ২০২২ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৮ দশমিক সাত শতাংশ।

এমন বাস্তবতায় জনসংখ্যা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে ধরে রাখতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে বিনা মূল্যে ও স্বল্পমূল্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।