জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রয়োজন তামাকমুক্ত সমাজ

. . . মাছুম বিল্লাহ ভূঞা: স্বাস্থ্যবান মানুষ পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ হলেও পক্ষান্তরে একজন অসুস্থ মানুষ সমাজের জন্যই বোঝাস্বরূপ। জীবনের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার হলেও জনস্বাস্থ্যের অধিকারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্বাস্থ্য খাতে কিছু অর্জন এবং কিছু সূচকের অগ্রগতি ঘটলেও তামাক কোম্পানির প্রলুব্ধকরণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের জনস্বাস্থ্য নিয়ে সন্তুষ্টি পর্যায়ে আসেনি। এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী তামাকজাত পণ্য। রাষ্ট্র কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮তে তামাক পণ্যকে অর্থকরী ফসলের তালিকাভুক্ত করেছে। এটি দুঃখজনক।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রসহ জনসমাগমের স্থান প্লেস, রাস্তা ও পরিবহনে ধূমপানের সময় ধোঁয়ার অংশবিশেষ যখন চারপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ৩ কোটি ৮৪ লাখ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ অনৈচ্ছিকভাবে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৯২টি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা ২০১০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিজে ধূমপান না করলেও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার-ই হলো শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর ৮৬ লাখের বেশি মানুষের দারিদ্র্য বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু প্রতি বছর তামাকজাত পণ্য ব্যবহার ও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এছাড়া তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে প্রতি বছর (প্রায়) ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এজন্যই জনস্বাস্থ্য ও জনজীবন সুরক্ষার দিকে দৃষ্টি দেয়ার সময় এখনই।  

২০২১ সালে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ঈড়সসরঃ ঞড় ছঁরঃ অর্থাৎ ‘আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, জীবন বাঁচাতে তামাক ছাড়ি’। মানুষ হত্যাসহ জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির জন্য তামাক কোম্পানির যেন কোনো প্রকার দায় নেই। তামাক জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর একটি প্রাণঘাতী ও সর্বগ্রাসী পণ্য। কিন্তু রাজস্বের অজুহাতে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় অবাধেই চলছে তামাক ব্যবসা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলেও ‘২০৩০ সালের মধ্যে’ তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের কোনো বছর কতটুকু পরিমাণ কমানো হবে, কীভাবে কমানো হবে তা সুস্পষ্ট বলা হয়নি এবং ওই সময়ে তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের ফলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং মানুষের অকাল মৃত্যুর জন্য তামাকজাত কোম্পানিগুলোকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনা হয়নি।

জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় হুমকি তামাক। তাই ফ্র্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অব টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) জাতিসংঘের এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ২০০৩ সালে প্রথম সই করে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে। এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, বিকল্প ফসল চাষ করতে কৃষককে ভুর্তকি ও প্রণোদনা প্রদান করা। কৃষি পণ্যের উৎপাদন ঝুঁকি লাগবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে যুগোপযোগী করা। সরকার তামাক চাষ বন্ধে পর্যাক্রমিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তামাক চাষিদের বিকল্প ফসল চাষ করতে উৎসাহিত করবে, প্রয়োজনে চাষিদের অন্য ফসল চাষে ভুর্তকি দেবে। তামাক প্রক্রিয়াজাত কাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। তামাকের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করবে। এফটিসির ধারা- ১৯ এ উল্লেখ আছে, তামাক কোম্পানিকে সিভিল ও ক্রিমিনাল লাইবেলিটির আওতায় আনার বিষয়টি। তাই তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন যুগোপযোগী করার দরকার এবং আইন তামাক কোম্পানিকে সিভিল ও ক্রিমিনাল লাইবেলিটির আওতায় আনা বিষয়টি যুক্ত করে হবে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ২০১৬ সালে সাউথ এশিয়ান স্পিকার সামিটে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। এছাড়া বাংলাদেশ সংবিধান অনুসারে মানুষের জীবন রক্ষার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এর পাশাপাশি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায় ও নির্দেশনা রয়েছে। প্রফেসর নুরুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ সরকার মামলায় (রিট পিটিশন নং-১৮২৫/১৯৯৯) [২০ বিএলডি (এইসসিডি) ২০০০ (৩৭৭-৪০৪)] মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিদ্যমান তামাকজাত দ্রব্য প্রক্রিয়াকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের নিমিত্তে নির্দেশ দান করবে এবং এরজন্য যুক্তিসঙ্গত সময় বেঁধে দেবে, তামাক ব্যবসা বন্ধ করতে। ওই নির্দেশনা প্রদান করে ২০০০ সালে। সেই হিসাব গণ্য করে ২০৩০ সালের মধ্যে তামাক ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। তার জন্য কিছু নির্দেশনা সরকারকে আইনে যুক্ত করতে হবে।

দেশকে তামাকমুক্ত করা গেলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস এবং চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকার চাইলেই স্বাস্থ্য খাত ও অর্থ খাত দুটোকেই একসঙ্গে সুরক্ষা দিতে পারে। জাতিসংঘের মতে, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘সার্বজনীন স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করা। 

নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি আমাদের সংবিধানেই রয়েছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ বিষয়টি গুরুত্ব পায় ১৯৭৮ সালে সে সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের ও বর্তমানে কাজাখস্তানের রাজধানী আলমা আতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও সবার জন্য স্বাস্থ্যের কথা বলা হলেও ব্যবস্থার বদল খুব একটা হয়নি। যদিও বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও উন্নয়নের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরলভাবে একে ব্যাখ্যা করা বা বোঝা কঠিন। অনেক সূচকে আমাদের অগ্রগতি আছে। মাতৃমৃত্যু কমেছে; তবে কমার গতি আগের তুলনায় ধীর হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন না হলে দারিদ্র্য দূর হবে না।

তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করতে চাইলে, বর্তমান তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে নিন্মোক্ত বিধান সংযুক্ত করা প্রয়োজন। তামাকজাত কোম্পানীগুলো কৃষকদের তামাক চাষ করার জন্য যে অগ্রিম অর্থ (দাদন দিয়ে) প্রদানের মাধ্যমে প্ররোচিত করে, তা বন্ধ করতে হবে। আর কোনো নতুন জমিতে তামাক চাষ করা যাবে না, তা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। প্রতিবছর কী পরিমাণ জমিতে তামাক চাষ বন্ধ করা হবে এবং আগামী ৫ বছরে কোন এলাকায় কতটুকু জমিনে তামাক চাষ বন্ধ করবে তার জন্য আইনে যুক্ত করা। তামাক কোম্পানির তথাকথিত সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি (সিএসআর) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। বিড়ি-সিগারেটের খুচরা শলাকা এবং জর্দা-গুল বিক্রি নিষিদ্ধ করা। তামাক মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাইলে তামাক কোম্পানিকে সিভিল ও ক্রিমিনাল লাইবেলিটির আওতায় আনতে হবে।

সেই হিসেবে গণ্য করে ২০৩০ সালের মধ্যে তামাক ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। তার জন্য কিছু নির্দেশনা সরকারকে আইন যুক্ত করতে হবে। যেমন: ২০২২ সাল হতে তামাক ব্যবহার জনিত রোগের সব চিকিৎসা ব্যয় তামাক কোম্পানিকে বহন করতে হবে। ২০২৫ সাল হতে তামাক কোম্পানিকে সিভিল লায়াবিলিটির আওতায় আনা এবং ২০৩০ সাল হতে তামাক কোম্পানিকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনা। তখন তামাক কোম্পানি নিজের চিন্তা-ভাবনা করবে কি ভাবে এবং কত দ্রুত সময়ের মধ্যে তারা তামাক উৎপাদন, ব্যবসা, বিপণন ও সরবরাহ বন্ধ করবে।

তামাক ব্যবহারের কারণে তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে প্রতি বছর বাংলাদেশে (প্রায়) ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং তামাকজনিত রোগব্যাধি ও অকাল মৃত্যুর কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়। এককভাবে সিগারেটের বাজারের ৬৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি এবং ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে জাপান টোব্যাকো কোম্পানি, বাকি ১৬ শতাংশ দেশীয় অন্যান্য তামাক কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এই বিশাল সংখ্যক মানুষের চিকিৎসার দায়ভার ৬৪ শতাংশ ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি, ২০ শতাংশ জাপান টোব্যাকো কোম্পানি, বাকি ১৬ শতাংশ দেশীয় অন্যান্য তামাক কোম্পানিগুলোর ওপর বর্তায় এবং এসব মানুষের চিকিৎসার সবদায়ভার ওইসব তামাক কোম্পানিকে নিতে হবে। ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটানোর জন্য ফৌজদারি অপরাধে দায়বদ্ধতার আওতায় আনাও সমীচীন বটে। [ড. মোহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ এবং অন্যান্য {১৭ ডিএলআর (১৯৯৭) এডি, ১} মামলা, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদের আলোকে সংবিধানের ৩১ ও  ৩২ অনেচ্ছেদকে বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং সুস্বাস্থ্য রক্ষা ও স্বাভাবিক দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করাকেও জীবনের অধিকারের মধ্যে ব্যাখ্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন।]

সিভিল লায়াবিলিটির আওতায় আনা হলে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে হয়তো ব্যবসা করবে। কিন্তু ফৌজদারি অপরাধ এর আওতায় আনা হলে শুধু জরিমানা দিয়ে পার পাবে না, তামাক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে জেল কারাগারেও যেতে হবে। তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের ফলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি, মানুষের চিকিৎসা এবং মানুষের অকাল মৃত্যুর জন্য তামাকজাত কোম্পানিগুলোকে দ্বায়বদ্ধতার আওতায় আনা হলে। তামাক কোম্পানি তামাক ব্যবসা থেকে নিবৃত্ত হলেই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা পাবে।

আইনজীবী

masumbillahlaw06@gmail.com