ডায়রিয়া প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রয়াস নিন

ডায়রিয়া এখন আর প্রাণঘাতী রোগ নয়। আগে যেটি কলেরা হিসেবে বিশ্বে লাখো মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, সেটি এখন কারও মনেই ভীতি জাগায় না। আর এতে বাংলাদেশের অবদানও বিশ্বের স্বীকৃতি পেয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্ভাবন, চিকিৎসা, রোগী ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধে নানা সাফল্য রেখেছে রাজধানীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। প্রতিষ্ঠানটি গত ৬০ বছরে ওরস্যালাইন, ডায়রিয়া চিকিৎসায় জিংকের ব্যবহার, শিশুদের তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসাপদ্ধতি, জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশের জন্য পথসঞ্চারী গবেষণা, মুখে খাওয়া কলেরার টিকা তৈরিতে সাফল্য দেখিয়েছে। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশের কোটি কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে ওরস্যালাইন। প্রতিষ্ঠনটির ব্যাপ্তি দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে নানা দেশে।

২০০৭ সালে এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত খাওয়ার স্যালাইন সারা বিশ্বে বছরে ৪০ লাখ হিসেবে প্রায় ৫ কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে। এ হিসাবে ২০১৯ পর্যন্ত খাওয়ার স্যালাইনের ব্যবহার ৭ কোটিরও বেশি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১২ সালে খ্যাতনামা চিকিৎসাসায়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ খাওয়ার স্যালাইনকে ‘বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসংক্রান্ত আবিষ্কার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আইসিডিডিআর,বির তৈরি মুখে খাওয়ার সাশ্রয়ী কলেরার টিকা (ওসিভি), এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মজুত করছে। তাদের মজুত থেকে বিভিন্ন দেশ কলেরা টিকা পেয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন বেঁচেছে।

২০০২ সালে আইসিডিডিআর,বি বিজ্ঞানীরা দেখান, ডায়রিয়া চিকিৎসায় জিংকের ব্যবহার শিশুদের মৃত্যুহার কমায়। ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ ডায়রিয়া চিকিৎসায় খাওয়ার স্যালাইনের পাশাপাশি জিংক ব্যবহারকে একমাত্র চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি অনেক উন্নয়নশীল দেশকে শিশুমৃত্যু কমাতে উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করেছে।

আইসিডিডিআর,বির অর্জন এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর ব্যাপক প্রচারে সাধারণ মানুষও পেটের পীড়া, ডায়রিয়ার কারণ ও প্রাথমিক প্রতিষেধক সম্পর্কে সম্যক অবহিত আছেন। এত অর্জন সত্ত্বেও সম্প্রতি রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। গত কয়েকদিনে মহাখালীর আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে রেকর্ড-সংখ্যক রোগী ভর্তি হয়েছে। এদের অধিকাংশেরই চিকিৎসার জন্য ভর্তি করতে হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বির চিকিৎসকরা বলছেন, গত ৬০ বছরে এত রোগীর চাপ দেখা যায়নি। হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার চেয়ে রোগী বেশি হওয়ায় বাইরে তাঁবু টানিয়ে বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

আমরা মনে করি, ডায়রিয়া এখন নিরাময়যোগ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষ একে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। ডায়রিয়া পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ। তাই নিরাপদ পানি ও খাবার গ্রহণ করতে হবে। খাবার তৈরির আগে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে এবং শৌচাগার থেকে ফেরার পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুদের পরিচ্ছন্ন থাকায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। নখ কেটে সব সময় ছোট রাখতে হবে। পরিষ্কার স্থানে খাবার রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিটি বাসাবাড়িতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় রাখা উচিত। ডায়রিয়ার চিকিৎসা সহজ ও সহজলভ্য হলেও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধে প্রত্যেক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে।