ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন

রুহানা আক্তার বৃষ্টি: বর্তমান সময়ে বহুল আলোচিত একটি বিষয় ডেঙ্গু জ্বর। ডেঙ্গু মূলত এডিস ইজিপ্টি নামক মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে দেখা যায়। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বিশেষ করে বর্ষার মৌসুমে শুরু হয়, যার ব্যাপ্তিকাল জুন-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে। বাংলাদেশে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ অনুকূল জলবায়ু। কেননা, বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার ফলে বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকে, যার মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়।

 সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা বৃষ্টিপাত হয় এবং সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এর ফলে কোরবানির পশুর বর্জ্য, রক্ত পানিতে মিশে যায়, যা মশার বংশবিস্তার করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। এছাড়া এবারের ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন অফিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। ধারণা করা যাচ্ছে, বৃষ্টিপাতের কারণে এসব স্থানে পানি জমা থাকতে পারে; যা প্রাণঘাতী এডিস মশার নিরবচ্ছিন্ন বংশবিস্তারে সহায়ক। 

কথায় আছে, প্রতিকারের চেয়ে? প্রতিরোধ উত্তম। ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি বহুমুখী পদ্ধতি প্রয়ে?াজন, যেখানে ব্যক্তি, পরিবার, সিটি করপোরেশন, সরকার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে করণীয়: বাসার ব্যালকনিতে রাখা ফুলের টবে পানি জমতে দেয়া যাবে না। ভাঙা পাত্র, পরিত্যক্ত জিনিসপত্র রাখা যাবে না। যেহেতু বৃষ্টিপাত হওয়ার পর মশার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়, তাই নিয়মিত ছাদবাগান এবং বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। ঘুমানোর সময় মশারি টাঙাতে হবে এবং মশা নিরোধক স্প্রে- এরোসল ব্যবহার করা যেতে পারে, জানালায় মসকিটো নেট লাগাতে হবে। মনে রাখবেন, যে কোনো সমস্যা সমাধানে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং উদ্যোগ সব থেকে বড় হাতিয়ার।

পরিবারের সদস্যদের করণীয়: একটি পরিবার বিভিন্ন বয়সের সদস্য থাকে। যেহেতু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু অসতর্কতার ফলে যে কোনো সময় শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর হতে পারে। তাই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের উচিত শিশুদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা। বিশেষ করে নবজাতকদের সার্বক্ষণিক মশারির মধ্যে রাখা। বাড়ির প্রতিটি কক্ষে নিয়মিত মশা নিরোধক স্প্রে করা।

সিটি করপোরেশনের করণীয়: যদিও ঢাকা শহরের সব জায়গা সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত নয়। যতটুকু আওতাভুক্ত এলাকা রয়েছে, সেসব স্থান দক্ষ লোক দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেসব স্থানে মশার উপদ্রব বেশি সেসব স্থানে কার্যকর পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে মশার বংশবিস্তার কমাতে হবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করতে হবে। কারণ বিভিন্ন জায়গায় বর্জ্য উš§ুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে, সেগুলোয় পানি জমে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি করে। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে কার্যক্রম ফলপ্রসূ করা সম্ভব নয়। দেশের জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের সব প্রতিনিধি এবং নাগরিকদের এডিস মশা নির্মূল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করণীয়: দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। যেসব রোগীদের প্লাটিলেট অধিকহারে কমে গেছে; তাদের জন্য দ্রুততম সময়ে রক্তের ব্যবস্থা করা। হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, চিকিৎসক ও নার্সদের সর্বদা প্রস্তুত রাখা। টাকার অভাবে যেন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা হীনতায় ভুগতে না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সুলভ মূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করণীয়: ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গত ৯ জুলাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছে। শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, হল, প্রতিষ্ঠানের চারপাশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান করে। তাই এসব স্থান নিরাপদ থাকা জরুরি।

সরকারের করণীয়: ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইতোমধ্যে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক জরিপ করে বিভিন্ন প্রজাতির মশা নিয়ে গবেষণা করা জরুরি এবং মশা নিধনের জন্য আধুনিক কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করা প্রয়োজন। এখানে মূলত সরকারের দায়িত্ব নির্দেশনা দেয়া এবং এই নির্দেশনা অনুযায়ী ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কার্যক্রম প্রসারিত করতে হবে। পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

শিক্ষার্থী

লোকপ্রশাসন বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়