আরফাতুর রহমান শাওন: গ্রীষ্মের আগমন হবে প্রচণ্ড তাপমাত্রার সঙ্গেÑএটাই স্বাভাবিক নিয়মে চলে আছে। কিন্তু চলতি বছরের চৈত্রের তাপদহ মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, এখন আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে। বৈশাখ শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু কোথাও বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও নেই। তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি ভাবতেই যেন অবিশ্বাস্য লাগছে।
একটা সময় ছিল যখন আমরা শুনতাম ভারতে ৪০- ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, তখন আমাদের চোখ আকাশে উঠে যেত। এ সময় দখিনা হাওয়া নেই, বাতাসের আর্দ্রতা কম, মানে জলীয়বাষ্পও তেমন নেই। এ কারণে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে, অসহনীয় গরমও অনুভূত হচ্ছে। এখন এই গরম থেকে রেহাই নেই।
বর্তমানে পবিত্র রমজান মাস চলছে। ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় দিনের বেলায় সিয়াম পালন করছেন। বৈশাখের এই সময়ে প্রচণ্ড তাপদাহে তাদের ওষ্ঠাগতপ্রাণ। একটু বৃষ্টি হলে হয়তো গরমের তীব্রতা কমে যাবে। রোজাদারসহ সবাই কিছুটা স্বস্তি পাবেন। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তর তিন দিনের আগে দেশবাসীর জন্য সেই আশার বাণী শোনাতে পারছে না। তাছাড়া এই গরমকে আবহাওয়া অধিদফতর তীব্র গরম মনে করছে না। তাদের বর্ণনায় এটি মৃদু গরম। ফলে শহর-গ্রাম কোথাও স্বস্তিতে নেই মানুষ। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের কষ্ট এ পরিস্থিতিতে চরমে উঠেছে। চলমান তাপপ্রবাহে সবচেয়ে কষ্টে পড়েছেন খেটে খাওয়া দিন-মজুর, রিকশা-ভ্যান চালক ও কৃষকরা। এদিকে তীব্র খরায় ঝরে যাচ্ছে আম-লিচুর গুটি। বোরো ধান ও সবজিক্ষেতে প্রতিদিন সেচ দিতে হচ্ছে। সূর্যের প্রখরতায় আর পিচঢালা পথের উষ্ণতায় চলাচল করা খুবই কষ্টকর হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।
একটানা তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় হিট স্ট্রোক, হƒদরোগ, ডায়রিয়া, শিশুদের নিউমোনিয়াসহ গরমজনিত রোগ বাড়ছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গরমের প্রভাবে সবচেয়ে সংকটে আছেন পরিবারের প্রবীণ ও শিশুরা। বাড়ি বাড়ি গরমজনিত জ্বর-ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। গরমে শিশুদের ডায়রিয়া, টাইফয়েড, শরীরে ঘাম বসে নিউমোনিয়া, ঠাণ্ডা, সর্দি, কাশি, জ্বর ও প্রস্রাবে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এসব রোগ নিয়েই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে তারা। শিশুকে ঘরের বাইরে বের হতে দেয়া যাবে না। টাটকা খাবার খাওয়াতে এবং ফ্যানের নিচে রাখতে হবে।
এদিকে প্রচণ্ড গরমে অনেকের ঠোঁটের চামড়া উঠে যাচ্ছে। অনেকের হাত-পা জ্বালাপোড়া করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছে, শুষ্কতার কারণে চামড়ার জলীয় অংশ দ্রুত কমে যাচ্ছে। ঠোঁটের চামড়া পাতলা হওয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ঢাকার আর্দ্রতা এই সময়ে যেখানে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে তা ১৭ শতাংশে নেমে আসে। ফলে আমাদের ঠোঁট ফাটছে অথবা শরীর ঘামলেও দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। আর্দ্রতা যদি ৭০ শতাংশ বা এর কাছাকাছি থাকত, তাহলে গরম আরও বেশি অনুভূত হতো। আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিমাণ কম থাকার কারণে ঘামলেও তাড়াতাড়ি শুকাচ্ছে। বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প দরকার, কিন্তু সেটা পাচ্ছে না। ফলে বাতাস যেখান থেকে পারছে জলীয় বাষ্প টানছে।
এই আবহাওয়ার জন্য দায়ী কে? গবেষণায় জানা গেছে, ১৯৫০ সালের পর থেকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর জলবায়ু যেভাবে বদলে গেছে তার জন্য মানুষই দায়ী বলে নিশ্চিত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গত ৫০ বছরে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সবুজ এই গ্রহটি কীভাবে ক্রমশ প্রাণীর বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে উঠেছে। মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই যে বিশ্বের জলবায়ু উষ্ণ হয়ে উঠছেÑসে বিষয়ে শতকার ৯৫ ভাগ নিশ্চিত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভূ-পৃষ্ঠ, সাগর কিংবা বায়ুমণ্ডলÑসব ক্ষেত্রেই এর নমুনা স্পষ্ট।
বাংলাদেশে মহানগরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ জেলা ও উপজেলা শহর এবং গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে ভূমির ব্যবহার করতে হবে, যেখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য জলাভূমি, বনাঞ্চল টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা থাকবে। তাছাড়া দেখা যাচ্ছে, আমাদের বাংলাদেশে ঘরে ঘরে দিন দিন এসির ব্যবহার বৃদ্ধি, মাত্রাতিরিক্ত যানবাহানের পদাচরণ, কালো ধোয়া নির্গমন, বৃক্ষনিধন ইত্যাদির কারণে তাপদহ তথা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এখনই সময় এই তাপদহ তথা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নতুবা অদূর ভবিষ্যৎতে মানুষ উষ্ণাতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে অনেক কষ্ট হবে। শুধু তাই নয়, বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারের কিছু যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আকাশ থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পানি স্প্রে করা, সড়কে পানি দিয়ে রাস্তা স্প্রে করা, যেহেতু বাতাসের জলীয় বাষ্প কম সেহেতু বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বেসরকারি সংস্থাগুলো পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষক, মিল্লাত উচ্চ বিদ্যালয়
বংশাল, ঢাকা