সাইফ পাওয়ারটেক

দুই বছরেও চালু হয়নি দুবাই চট্টগ্রাম কার্গো জাহাজ সার্ভিস

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দুই বছর আগে সাইফ পাওয়ারটেক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) জানায় যে তারা জাহাজ পরিচালনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাফিন ফিডার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। আর প্রথম বাংলাদেশি কোম্পানি হিসাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরা বন্দর থেকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য বন্দরে আমদানি পণ্য পরিবহনের জন্য আটটি জাহাজ পরিচালনা করবে। কিন্তু এ চুক্তির দুই বছর পেরিয়ে গেলও বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখছেন না সাইফ পাওয়ারটেকের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

সাইফ পাওয়ারটেক সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১ মার্চ সাইফ পাওয়ারটেক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) জানায় যে তারা জাহাজ পরিচালনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাফিন ফিডার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সাফিন ফিডার হলো আরব আমিরাতভিত্তিক কনটেইনার ফিডার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। এডি পোর্টস গ্রুপ কর্তৃক ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি মূলত আরব উপসাগর ও ভারতীয় উপমহাদেশের কনটেইনার পরিবহন নেটওয়ার্কে সেবা দিয়ে থাকে। এ চুক্তির শর্তাবলির আওতায় সাফিন ফিডারস ও সাইফ পাওয়ারটেক ১৫ বছরের মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে কার্গো সেবা দিতে একসঙ্গে কাজ করবে। এ কাজের জন্য সাইফ পাওয়ারটেক সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাইফ ইউনাইটেড শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং নামে একটি সহযোগী কোম্পানি চালু করেছে। কোম্পানিটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরা বন্দর থেকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য বন্দরে আমদানি পণ্য পরিবহনের জন্য আটটি ভাড়ায় জাহাজ পরিচালনা করবে। আর জাহাজগুলো ১৫ বছর চুক্তিতে পরিচালনা করবে সাইফ ইউনাইটেড শিপিং। প্রত্যেকটি জাহাজের ধারণক্ষমতা হবে ৫৫ হাজার ডিডব্লিউটি।

এতে বছরের (২০২২ সালের হিসাব) প্রতি জাহাজ থেকে বছরের ১৫৪ কোটি টাকা রাজস্ব আর নিট মুনাফা ১৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা করে হবে। সেই হিসাবে তখন ১৫ বছরের নিট মুনাফা হতো এক হাজার ৮৫৭ কোটি টাকারও বেশি। তবে এই ব্যবসা পরিচালনায় কত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ কার্গো পরিবহন সার্ভিস গত দুই বছরের চালু হয়নি। এ বিষয়ে কোম্পানিটির কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আরও জানা যায়, সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড গত ২০২১ সালে অক্টোবরে রেলওয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ৩০৮ কোটি টাকা অফ ডক সেবা কনটেইনার ডিপো নির্মাণ করার ঘোষণা দেয়। একই বছরের ডিসেম্বরের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশন খাতে ব্যবসার জন্য ৮৮ ইনোভেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ৫৫ শতাংশ শেয়ার হোল্ডিং নেয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে ১১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। যদি প্রকল্পটি ১০০ কোটি টাকার। একই সময়ে তেল ও গ্যাস অপারেশন খাতে ৪৭৩ কোটি টাকা বিনিয়োগের বোর্ড সিদ্ধান্তের কথা জানা কোম্পানিটি। এরপর ২০২২ সালের ১৯ জুন সাইফ মেরিটাইন এলএলসি’র ১০০ ভাগ মালিকানা অধিগ্রহণ করা সিদ্ধান্ত নেয়া কথা জানানো হয়েছিল হয়। এরপর ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে দক্ষিণ ভারতের পণ্য পরিবহনে কলকাতার শ্যামা মুখার্জি পোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছিল। এরপর ১০ ডিসেম্বরে ইনোভেশন লজিস্টিকস অ্যান্ড শিপিং লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন বোর্ড। সর্বশেষ ডিজিটাল সার্ভে, সয়েলস্টেট এবং আনুধিক ডিজিটাল সয়েল স্টেট ল্যাব করার জন্য গৃহায়ন নামে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ৬৫ শতাংশ শেয়ারের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।

কয়েকজন সাধারণ বিনিয়োগাকারী বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সেবা ও আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক গত তিন বছরের দুবাই থেকে চট্টগ্রাম কার্গো জাহাজ পরিচালনা, কনটেইনার ডিপো স্থাপন, আমদানি ও রপ্তানি সহায়ক প্রতিষ্ঠান পরিচালনসহ অনেকগুলো উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু তেমন বাস্তবায়ন হয়েছে বলে জানা যায়নি। এসব ঘোষণা শুধু ই কি ঘোষণা ছিল তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব বিএসইসির। এছাড়া সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব ২০২৩-২৪ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়ার ঘোষণা করেছিল। সেই হিসাবে একজন বিনিয়োগকারী প্রতি শেয়ারের বিপরীতে মাত্র ১০ পয়সা লভ্যাংশ পাবে। প্রতিষ্ঠানটি সেই লভ্যাংশ গত দুই মাসেও বিনিয়োগাকারীদের দিতে পারেনি। অথচ কোম্পানির রিজার্ভে ১৬৮ কোটি টাকা আছে, যা নিয়ে বিনিয়োগাকারীদের বিরূপ মনোভাব দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ বিনিয়োগাকারীর শেয়ার কেনার অনেক বেশি দামে। বর্তমানে শেয়ারের দাম ১২ টাকার কাছাকাছি।
এ বিষয়ে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিভিস করেন, কিন্তু কোনো শব্দ শোনা যায় না। ফলে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে জানা যায় তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। পরে সাইফ পাওয়ারটেকের পরিচালক সাইফ তরফদারকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে উনার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরে সাইফ পাওয়ারটেকের কোম্পানির সচিব এফ মোহাম্মদ সালেহিন শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের গত কয়েক বছরের যেসব মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেই সব ঘোষণা বাস্তবায়নে কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজ দীর্ঘমেয়াদি বলে সময় লাগছে। তবে তা বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া আমরা ঘোষিত লভ্যাংশ এ মাসের মধ্যে পরিশোধ করব। এমন প্রস্তুতি চলছে। আশা করি, বিনিয়োগকারীরা এ মাসে তাদের লভ্যাংশ পাবেন। উল্লেখ, ২০১৪ সালে দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে সেবা ও আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত সাইফ পাওয়ারটেক অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৭৯ কোটি টাকা। যার মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার মালিকানা আছে ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ১৮ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগাকারীদের হাতে মালিকানা রয়েছে ৪১ দশমিক ৭১ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ৭০ পয়সা। আলোচিত সমাপ্ত হিসাব অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ হয়েছে এক টাকা ৮৮ পয়সা। গত ৩০ জুন কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৭ টাকা এক পয়সা। এ সময়ে বিনিয়োগাকরীদের জন্য ১ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল।