জাকারিয়া পলাশ: শ্যামলী পরিবহন যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৮৮ সালে। পাবনা-ঈশ্বরদী রুটে একটি বাস নিয়ে তখন পরিবহন সেবা শুরু করে কোম্পানিটি। রমেন্দ্রনাথ ঘোষ ওরফে নোয়া ঘোষ ও রমেশ চন্দ্র ঘোষ নামে দুই ভাইয়ের উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছিল কোম্পানিটি। বছর দেড়েক আগে দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায় কোম্পানির মালিকানা। তার পর থেকে শ্যামলী পরিবহনের একই নামে দুটো আলাদা সেবা চালু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবহন কোম্পানিটির মূল ব্র্যান্ড নাম ‘শ্যামলী’ অপরিবর্তিত রেখেই দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হয় এর মালিকানা। তবে এর পরিচালনা করছে দুই ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন আলাদা কোম্পানি। বড় ভাই রমেশ চন্দ্র ঘোষের অধীনে শ্যামলী পরিবহন বা এসপি নামে চলছে একটি। আর ছোট ভাই রমেন্দ্র নাথ ঘোষ ওরফে নোয়া ঘোষের মালিকানায় চলছে শ্যামলী পরিবহনেরই অপর অংশ। তবে এই অংশের ব্র্যান্ডের সঙ্গে লেখা হচ্ছে এনআর ট্রাভেলস পরিচয়টি।
জানা গেছে, নোয়া ঘোষ ও তার ছেলে শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশের নামানুসারে এনআর ট্রাভেলস নামে আলাদা কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানিটিই শ্যামলী পরিবহনের একাংশের পরিচালনা করছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সায়েদাবাদ, গাবতলী, শ্যামলী, ফকিরাপুল, পান্থপথসহ প্রায় সব বাসস্ট্যান্ডে দুই অংশের আলাদা কাউন্টার রয়েছে। তবে সেসব কাউন্টারের কর্মীরা যাত্রীদের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্ট করছেন না। উভয় অংশের কাউন্টারগুলোর মধ্যে যাত্রী ধরে রাখার প্রতিযোগিতাও দেখা গেছে। তবে দুই কাউন্টারের একাংশে শুধু শ্যামলী পরিবহনের নাম লেখা থাকলেও অপর অংশের সাইনবোর্ডে ছোট্ট করে লেখা রয়েছে ‘পরিচালনায়: এনআর ট্রাভেলস’। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে একেক কাউন্টারের কর্মীরা একেক কথা জানাচ্ছেন। কোথাও বলা হচ্ছে, সব কাউন্টারই এক, এদের মধ্যে কোনো তফাত নেই। আবার কোথাও বলা হচ্ছে, দুই ভাইয়ের মধ্যে কোম্পানি ভাগাভাগি হয়েছে। তাই আলাদা কাউন্টার স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেবার বিষয়ে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
এ প্রসঙ্গে শ্যামলী পরিবহনের (এনআর) পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা ঘোষ পরিবারের লোক। দাদা অবিনাশ চন্দ্র ঘোষ দুধ-ছানা প্রস্তুত ও বিপণনের কাজ করতেন। আমার বাবা-চাচারা ছিলেন ছয় ভাই। তারাও পারিবারিকভাবে এই ব্যবসা করতেন। কিন্তু আমার বাবা নোয়া ঘোষ (ছয় ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়) প্রথম পরিবহন খাতে ব্যবসা করার উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালে একটা টেম্পো কিনে তা চালাতে শুরু করেন। আমার মেঝো চাচা রমেশ ঘোষও তাকে সহায়তা করেন। পরে ১৯৭৪ সালে বাবা ইংল্যান্ড মিটফোর্ড কোম্পানির একটা বাস কেনেন। পাবনা থেকে শুরু করলেও পরে ঢাকা-পাবনা রুটে সেবা শুরু করি। ধীরে ধীরে আমরা দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ রুটে ব্যবসা শুরু করি।
কোম্পানির বিভাজন সম্পর্কে তিনি বলেন, কোম্পানির মালিকানা ভাগ হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতা নেই। গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা দেওয়ার বিষয়ে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা আরও ভালো সেবা পাচ্ছেন। কোম্পানির মূল ব্যবসা ছিল নন-এসি বাস সার্ভিসের। এনআর ট্রাভেলস থেকে পরিচালনা শুরু করার পরই আমরা এসি বাস যুক্ত করেছি সেবায়। কোরিয়ান হুন্দাই, সুইডেনের স্ক্যানিয়া, জাপানের নতুন প্রযুক্তির হিনো আরএন ব্র্যান্ডের বেশ কিছু বাস এসেছে আমাদের সেবায়। এতে যাত্রীসেবার মান বেড়েছে।
উল্লেখ্য, পরিবহন খাতে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে দেশের বিভিন্ন রুটে। বর্তমানে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ছাড়া প্রায় সব রুটেই শ্যামলী পরিবহনের গাড়ি চলছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-উত্তরাঞ্চল ও ঢাকা-কুষ্টিয়া রুটে গাড়ি চলছে। ফেরিতে নদী পেরিয়ে পরিবহন সেবা সুবিধাজনক না হওয়া খুলনা ও বরিশালে এ কোম্পানির সেবা নেই বলে জানানো হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ সেবা ছাড়াও ঢাকা-কলকাতা, ঢাকা-আগরতলা, ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি ও ঢাকা-শিলিগুড়ি রুটে গাড়ি চলছে শ্যামলীর। তবে কয়েক বছর ধরেই কোম্পানির উদ্যোক্তা দুই ভাইয়ের মধ্যে মালিকানা নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। গত বছরের শুরুর দিকে দুই ভাই কোম্পানির গাড়িগুলোর মালিকানা নিয়ে আলাদা হয়ে যান। এখন এনআর পরিবহনের পরিচালনাধীন শ্যামলী পরিবহনের বহরে বেশ কিছু আধুনিক গাড়ি যুক্ত হয়েছে। তাছাড়া নোয়া ঘোষের ছেলে শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ উচ্চশিক্ষিত হওয়ায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনায়ও সংস্কার এনেছেন।
