দুর্বল ব্যাংককে সতর্কবার্তা দিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতে ‘প্রমোম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ)’ ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় সংকট ও সমস্যার ধরন অনুযায়ী কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টেনে তুলতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে; যা আগামী ২০২৫ সালের মার্চ থেকে কার্যকর হবে। মূলধন, খেলাপি ঋণ, তারল্য ও সুশাসন এই চার সূচকের ভিত্তিতে চারটি ক্যাটেগরিতে ব্যাংকগুলোকে পৃথক করে বিশেষ নজরদারি চালাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পিছিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোকে এসব সূচকে উন্নতির বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক হওয়া এবং সর্বাত্মক প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দেশের সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এই নির্দেশনা দেন তিনি। এছাড়া সভায় খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি এডিআর পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তিতে জোর দিতে বলা হয়েছে।

বৈঠক শেষে এবিবির চেয়ার?ম্যান ও বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আরএফ হোসেন বলেন, সভায় পিসিএ-ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ একটি সার্কুলার। কারণ এই প্রথম ব্যাংক খাতকে একটি ক্যাটেগরিভিত্তিক করা হচ্ছে। ক্যাটেগরি করার ক্ষেত্রে একটি ছক রয়েছে। ব্যাংকগুলো প্রতি প্রান্তিকে ওই ছক অনুযায়ী তথ্য দেবে। এতে যার যার ব্যাংকের ক্ষেত্রে নিজেরা একটি ধারণা পাবে। যেসব ব্যাংক দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, তারাও পদক্ষেপ নিতে পারবে। পদক্ষেপ নেয়ার পরও যদি কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন ঋণ দেয়া বন্ধ হতে পারে। এছাড়া নতুন শাখা ও নতুন ডিপোজিট নেয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ক্যাশ ডিভিডেন্ট ও স্টক ডিভিডেন্ট দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এই ধরনের পদক্ষেপ চালু করা খুবই জরুরি ছিল। এতে ব্যাংক খাত বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মার্জারের দিকে নিয়ে যাওয়াও হতে পারে। সরকার থেকে ওই রকম ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি ও ডলারের নতুন পদ্ধতি ছিল। মূল্যস্ফীতির জন্য যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা ধীরে ধীরে কমে আসবে। ডলারের ক্রলিং পেগ পদ্ধতি এপ্রিলের মধ্যে চালু হতে পারে। এতে ডলার মার্কেট একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে চলে আসবে। শর্ট টার্ম ট্রেড-বেসড যে ঋণ নেয়া হয়, তার সুদের সীমা যাতে তুলে দেয়া হয় অথবা এক শতাংশ বাড়িয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। যাতে বিভিন্ন ফরেন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সুবিধা হয়।

এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহাবুবুর রহমান বলেন, সভায় সার্বিক অর্থনীতি, মুদ্রানীতি ও পিসিএ-ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই পিসিএ-ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমেই দুর্বল ব্যাংকগুলাকে মার্জার পদ্ধতিতে নিয়ে যেতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ দুর্বল ব্যাংককে ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভ‚ত করা হতে পারে। এর মাধ্যমেই ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে যত যা-ই হোক না কেন গভর্নর এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এগিয়ে যাচ্ছে। সব ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন গভর্নর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ব্যাংকার্স সভায় নতুন মুদ্রানীতি, পিসিএ-ফ্রেমওয়ার্ক ও এডিআর পদ্ধতিতে খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন পিসিএ-ফ্রেমওয়ার্ক চলতি বছরের ডিসেম্বরভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে প্রয়োগ করা হবে, যা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের জানানো হয়েছে। যেভাবে টার্গেট দেয়া আছে, তা যেন অর্জন করতে পারে, সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণের মামলা কমাতে এডিআরের ব্যবহার বাড়াতে বলা হয়েছে। এতে মামলার সংখ্যা দ্রæত কমে আসবে। তাছাড়া এডিআরের সুবিধা নিয়ে কোনো গ্রাহক যাতে সময়ক্ষেপণ না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। মামলা পরিচালনায় যোগ্য আইনজ্ঞকে নিয়োগ করতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত সরকারের এবার প্রতিশ্রæতি ছিল, আর্থিক খাত সংস্কার। রাষ্ট্রপতিও তার ভাষণে আর্থিক খাতের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। একটি অ্যাকশন প্ল্যানও তৈরি করা হচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণ কমানো এবং সুশাসনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট টার্গেট নেয়া হবে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকের মার্জারের দিকে যাওয়া সহজ হবে।

মূল্যস্ফীতি না কমা পর্যন্ত মুদ্রানীতি সংকোচনমূলকই থাকবেÑউল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে তারল্য পরিস্থিতি আরও টাইট হবে। এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে সুবিধা দিতে কারেন্সি সোয়াপের দিকে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্টে বাংলাদেশ ব্যাংক কারেন্সি সোয়াপের দিকে যাচ্ছে। কারণ এখন অনেক ব্যাংকের কাছে ফরেন কারেন্সি হোল্ডিং বেশি রয়েছে। কিন্তু তার কাছে নগদ টাকা নেই। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নগদ টাকার সংকট মেটাতে ডলার বিক্রি করে দিতে হয়। আবার ডলার বিক্রি করে দিলেও তার রিস্ক থাকে। কারণ তার পরবর্তী পেমেন্ট দিতে গিয়ে ডলার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা থাকে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একটি কারেন্সি সোয়াপ ফ্রেমওয়ার্কের দিকে যাচ্ছে, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার রেখে টাকা নিতে পারে। আবার যখন প্রয়োজন হবে টাকা দিয়ে ডলার নেবে।

তারল্য সুবিধা নিয়ে মুখপাত্র বলেন, ব্যাংকগুলো সংকটে থাকলেই যে তারল্য সুবিধা নেয়, এমন নয়। তার দৈনন্দিন কাজের জন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে থাকে। এটা চলমান প্রক্রিয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময় এই ধার দিয়ে যাবে।

কলমানিতে বেশি রেটে ধার করা নিয়ে তিনি বলেন, কলমানিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত রেটের বাইরে লেনদেন না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেখানে কমে ধার দিচ্ছে, সেখানে অন্য জায়গা থেকে বেশি রেটে ধার করার মানে খরচ বেড়ে যাওয়া।