নিজস্ব প্রতিবেদক: ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লিমিটেডের তিন পরিচালক উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আদালত এরই মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
সূত্রমতে, উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে তাদের বিরুদ্ধে আমলযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. আছাদুজ্জামান তাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার এ আদেশ দেন।
আদালতে পেশ করা দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত মতিউর রহমান, মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দায় ও সম্পদের বিপুল অর্থের তথ্য গোপন, পরিচালক ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ লেনদেন, আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলন না ঘটিয়ে বিপুল তহবিল আহরণ ও কর ফাঁকির অপরাধ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এছাড়া পরিচালক ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে টিডিআর ইস্যু, ঋণ শ্রেণীকরণের গোপন ও সন্দেহজনক লেনদেনসহ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সম্পৃক্ত অপরাধ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।
ওই পরিচালকরা হলেন উত্তরা ফাইন্যান্স ও উত্তরা অটোমোবাইলসের ভাইস চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, উত্তরা ফাইন্যান্সের সাবেক পরিচালক মুজিবুর রহমান এবং উত্তরা ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম শামসুল আরেফিন। তাদের মধ্যে মতিউর রহমান ও মুজিবুর রহমান পরষ্পর আপন ভাই।
বিমা আইন বলছে, আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছেন অথবা প্রতারণামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত, অর্থনৈতিক অপরাধ ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ বিমা কোম্পানির পরিচালক পদের জন্য নির্বাচিত বা মনোনয়ন বা পদ ধারণের অযোগ্য।
ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তরা ফাইন্যান্স ও উত্তরা অটোমোবাইলসের ভাইস চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বিমা কোম্পানিটির ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭১ শেয়ারের মালিক এবং তার ছোট ভাই উত্তরা ফাইন্যান্সের সাবেক পরিচালক মুজিবুর রহমানের শেয়ারসংখ্যা ২২ লাখ। হিসাব অনুসারে মতিউর রহমান ও মুজিবুর রহমান এ দুই ভাইয়ের মোট শেয়ারসংখ্যা ৫১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭১টি, যা ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ। তবে আইন বলছে, নিজের পরিবারে পরিচালকসংখ্যা ২, কিন্তু ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ পাঁচ শতাংশের কম হলে তারা বিমা কোম্পানির পরিচালক পদ ধারণের জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। বিমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা ২০১৩-এর ফরম বীউনিক-খ’তে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যমতে, এসএম শামসুল আরেফিন উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রতিনিধিত্বকারী পরিচালক। বিমা কোম্পানিটিতে উত্তরা ফাইন্যান্সের শেয়ারসংখ্যা ২২ লাখ ২৭ হাজার ৩৯০টি। এরই মধ্যে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও আমানতদারদের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপে যুক্ত থাকার অপরাধে উত্তরা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ থেকে শামসুল আরেফিনকে অপসারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ গত ২৩ জুন তাকে অপসারণ করে। ব্যক্তি ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মিলে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতিউর রহমানদের সর্বমোট শেয়ার ধারণের পরিমাণ দুই কোটি ৫০ লাখ ২৮ হাজার ৫৮০টি, যা বিমা কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ২৩ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। উত্তরা অটোমোবাইলস, উত্তরা মটরস, উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং উত্তরা অ্যাপারেলস লিমিটেড তাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান।
অপরদিকে বিমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা ২০১৩-এর ফরম বীউনিক-খ অনুসারে, আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছেন অথবা প্রতারণামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত, অর্থনৈতিক অপরাধ ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বিমা কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালক পদের জন্য নির্বাচিত বা মনোনয়ন বা পদধারণের অযোগ্য। এ ছাড়া অন্যকোনো ব্যাংক কোম্পানি বা একই শ্রেণির বিমা কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকলেও তিনি বিমা কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালক পদের জন্য নির্বাচিত বা মনোনয়ন বা পদধারণের অযোগ্য।
বিমা আইন, ২০১০-এর ৭৫ ধারায় বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিমাকারীর পরিচালক একই শ্রেণির বিমা ব্যবসার জন্য নিবন্ধীকৃত অন্য কোন বিমাকারীর বা কোনো ব্যাংক-কোম্পানির বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারবেন না।