দেশীয় বিনিয়োগের প্রতিও মনোযোগ ধরে রাখতে হবে

‘দেশি বিনিয়োগেই বেশি কর্মসংস্থান, তবু কেন বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে বেশি উৎসাহ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকালের একটি জাতীয় দৈনিকে। কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিনিয়োগ। যত বেশি বিনিয়োগ, তত বেশি উৎপাদন এবং সেই অনুপাতে সৃষ্টি হয় কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য বলছে, কর্মসংস্থান তৈরিতে দেশীয় বিনিয়োগের অবদানই তুলনামূলকভাবে বেশি। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ এ দেশে তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। এ অভিযোগ যে অসত্য নয় তা বিডার পরিসংখ্যানেই পরিস্ফুট। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের বিপরীতে কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান দিয়েছে বিডা। সেখানে দেখা গেছে, বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে দেশে আনুষ্ঠানিক খাতে একজন মানুষের কর্মসংস্থান করতে যেখানে ৯৩ হাজার ৪২৮ ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, সেখানে স্থানীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় ৩৭ হাজার ৫২৮ ডলার। অর্থাৎ একই পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে দেশি বিনিয়োগের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ লাগে আড়াই গুণ।

বিদেশি বিনিয়োগ-উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বংলাদেশ। বিনিয়োগকারীরা যেখানে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবেন সেখানেই ব্যবসা করবেন। স্বভাবতই মনে করা হয় রাষ্ট্র বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তাতে কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু দেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে নয়। দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলেও কাক্সিক্ষত হারে তা বাড়ছে না।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের যে মুনাফা হয়, তা সাধারণত দেশেই থাকে এবং পুনর্বিনিয়োগ করেন তারা। ফলে দেশের সম্পদ দেশেই বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় সংযোগ ও সহযোগী শিল্প গড়ে ওঠার অবকাশ তৈরি হয়। অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলো মুনাফার একটি বড় অংশ নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যায়। স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সংযোগে গভীরতা আসে না। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি বিদেশি বিনিয়োগ থেকে যতটা উপকৃত হতে পারত, এসব কারণে ততটা পারে না। শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় বিনিয়োগ থেকে যে পরিমাণ কর্মসংস্থান হয়, বিদেশি বিনিয়োগ থেকে ততটা হয় না।

বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে উচ্চ প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান আসে; ব্যবসা-বাণিজ্যে আসে প্রতিযোগিতা। সরকারও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন করে। এতে কেবল যে তারাই উপকৃত হয় তা নয়, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ে, আমাদের বিনিয়োগকারীরাও শ্রম আইন পরিপালন ও কারখানার কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষায় পরিকল্পনায় ঢেলে সাজানোর কথা ভাবেন। তাই দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সমতা বজায় রাখা জরুরি।