সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশে এলপিজি গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বার্ষিক সক্ষমতা ২০ লাখ টন, যদিও বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা বছরে ১২ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ৪০ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে। এ খাতে কোম্পানিগুলোর ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, উৎপাদন পর্যায়ে মূসক আরোপ, ট্যারিফ ভ্যাট প্রত্যাহার, স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বৃদ্ধিসহ নতুন নীতিমালায় বেশকিছু কঠিন শর্ত আরোপের কারণে এ খাতে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে নতুন নীতিমালায় গুটিকয়েক বড় কোম্পানি লাভবান হলেও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়ছে বলে দাবি করেন উদ্যোক্তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট পূরণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত দেশের বিকাশমান এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) খাতে বিনিয়োগ করেন। বর্তমানে এ খাতে ৫৭টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হলেও ২৭টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গ্যাস আমদানি ও বিপণন করছে। এসব কোম্পানির বার্ষিক সক্ষমতা ২০ লাখ টন। যদিও বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ১২ লাখ টন। পাশাপাশি উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি থাকায় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা পশ্চাৎসংযোগ শিল্প হিসেবে সিলিন্ডার উৎপাদনের জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ১৪টি কারখানা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু নতুন নীতিমালায় বেশকিছু কঠিন শর্ত আরোপের কারণে এ খাতে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
একদিকে পথে পথে বিক্রি হচ্ছে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার, অন্যদিকে একই গ্যাস একেক কোম্পানি ইচ্ছামতো একেক দামে বিক্রি করছে। এতে ঠকছেন ভোক্তারা। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং এ খাতটিকে চাঙা করতে নীতিমালা সংশোধনসহ ১০ দফা প্রস্তাব করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষে থেকে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি উপদেষ্টার বরাবরে একটি চিঠি দেয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে সিলিন্ডার উৎপাদন পর্যায়ে পাঁচ শতাংশ হারে মূসক আরোপ করা হয়। আমদানি পর্যায়ে একই হারে কমানো হয়। এ কারণে দেশে উৎপাদনকারী সিলিন্ডারের মূল্য আমদানিকৃত সিলিন্ডারের চেয়ে বেশি পড়ছে। আর আমদানিনির্ভর হওয়া বিভিন্ন পর্যায়ে মূসক ও অন্যান্য শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।
অপরদিকে এলপি গ্যাসে ইউনিটপ্রতি ৯ টাকা (১২ কেজি) ট্যারিফ ভ্যাট প্রচলিত থাকলেও গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা উঠিয়ে বিক্রয়মূল্যের ওপর পাঁচ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়। এতে ভ্যাটের পরিমাণ চার-পাঁচগুণ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আগে প্রতি সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর আট থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত ট্যারিফ নির্ধারিত ছিল। বিক্রয়মূল্যের ওপর পাঁচ শতাংশ ট্যারিফ নির্ধারণ করায় প্রতিটি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৩৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর সিলিন্ডার গ্যাসের দামও ওঠানামা করে। দেশে এলপি গ্যাসের মূল্য
বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তা সমন্বয় করতে হিমশিম খাওয়ার পাশাপাশি বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। এতে দেশে গড়ে ওঠা নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালে এলপি গ্যাস অপারেশনাল ও লাইসেন্সিং নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার। এ নীতিমালায় একেকটি প্লান্টে মজুত ক্ষমতা পাঁচ হাজার টনে বৃদ্ধি করা ও পরিবহনের ক্ষেত্রে নিজস্ব জলযান ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। পাঁচ হাজার টন স্টোরেজ ক্ষমতা কেবল দেশের পাঁচ-সাতটি প্রতিষ্ঠানেরই রয়েছে। তাদের নিজস্ব জলযানও রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই তা নেই। মূলত সবল প্রতিষ্ঠানের লাভের জন্যই বিপুল পরিমাণ স্টোরেজ ক্ষমতার এমন অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। এ দুই শর্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন এ খাতের ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আছে।
এ অরাজকতা বন্ধে চট্টগ্রাম চেম্বার ১০টি প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এলপিজির লাইসেন্স প্রণয়ন, নবায়ন, তদারকিসহ সব বিষয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাংলাদেশ রেগুলেটরি কমিশন ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত করা; এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রয়, বিপণন ও হস্তান্তরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিসের ক্ষমতা বৃদ্ধি; খুচরা গ্যাস বিক্রির ওপর আরোপিত পাঁচ শতাংশ মূসক রদ; সিলিন্ডার বিক্রির ওপর নতুন করে আরোপিত পাঁচ শতাংশ মূসক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার; সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গ্যাসের মূল্য
নির্ধারণে বিশেষ কমিটি গঠন ও বাস্তবসম্মত যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা; বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) অতি উচ্চমূল্যে লাইসেন্স ফি হ্রাস করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অব্যাহতি দেয়া প্রভৃতি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থগিতাদেশ থাকার পরও এলপিজি গ্যাস মজুত ক্ষমতা পাঁচ হাজার টনে বৃদ্ধি করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বারবার চিঠি দিয়ে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি করতে গিয়ে চাহিদার তুলনায় একদিকে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হচ্ছে; কিন্তু সে অনুযায়ী ব্যবসা হচ্ছে না। এতে করে মুখ থুবড়ে পড়ছে এই খাত। ব্যাংকঋণ নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করছে সেসব প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হওয়ার পথে।
বোতলজাত গ্যাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের এলপিজি খাতের ব্যবসা বিকাশমান ও সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু বর্তমান নীতিমালার কারণে কিছু ব্যবসায়ীর হাতে এ ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে এলপিজি বিক্রির জন্য পরিবেশককে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নিতে হতো। নতুন নীতিমালায় তা শিথিল করা হয়েছে। এ কারণে যত্রতত্র এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। যে কারণে এলপিজির বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ইচ্ছামতো দরে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে, যা সংগতিপূর্ণ নয়। তাই আমরা এই শিল্পের জন্য একটি বৈষম্যহীন সুষ্ঠু নীতিমালা চাই, যাতে ভোক্তারা দুর্বল ও বৈষম্যমূলক নীতিমালার বলি না হন। এ ব্যবসায় শুরু থেকেই যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদের বিনিয়োগ যাতে হুমকিতে না পড়ে, সে বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিটিসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
উল্লেখ, আশির দশক থেকে বাংলাদেশে বোতলজাত বা সিলিন্ডার গ্যাসের বাজারজাত করা শুরু হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে তা বাড়তে থাকে। বর্তমানে শতভাগ আমদানিনির্ভর এ গ্যাসের চাহিদা বছরে ১২ লাখ টন।
