নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের পরিশোধিত মূলধন ৪৮৩ কোটি টাকা। এ প্রতিষ্ঠানের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরিশোধিত মূলধনের ১১ গুণের চেয়েও বেশি ব্যাংক ঋণ। বিপুল পরিমাণে ব্যাংক ঋণে থাকা জিপিএইচ চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে নিট মুনাফা করেছে ৩১ কোটি টাকা। আর ঋণের বিপরীতে সুদ হিসাবে পরিশোধ করেছে ২৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিট মুনাফার সাড়ে সাত গুণের বেশি ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মোট ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয়েছিল ৪৮০ কোটি টাকা। আর বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদ বৃদ্ধি পাওয়া এ ব্যয় আরও বাড়া সম্ভাবনা রয়েছে।
জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের পরিশোধিত মূলধন ৪৮৩ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর আগে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের স্টিল মিল স্থাপন করে; যা শুধু বাংলাদেশের প্রথম নয়, এশিয়া মহাদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তির প্রথম ইস্পাত কারখানা। আর এ ধরনের কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে দেশের ইস্পাত খাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির কারখানা স্থাপন ও কারখানা পরিচালনায় বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ হাজার ৪১২ কোটি ব্যাংক ঋণ হয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ তিন হাজার ২৫ কোটি টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দুই হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। এ বিপুল পরিমাণের ঋণের বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গত ছয় মাসে ২৪০ কোটি টাকা ঋণের সুদ হিসাবে পরিশোধ করতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ কারখানায় কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তির দিয়ে উৎপাদনকৃত রডের বিক্রিয়ের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা; যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল দুই হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের বিক্রি বেড়েছে মাত্র ৬৯ কোটি টাকা। এছাড়া গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পুরো সময়ে ব্যাংকের সুদ দিতে হয়েছিল ৪৮০ কোটি টাকা। এ সুদ ব্যয় আগের বছরে হয়েছিল ৫৩১ কোটি টাকা। যদিও গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জিপিএইচ ইস্পাতের মোট বিক্রয় রাজস্ব হয়েছিল ৫ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।
এদিকে ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধে চাপ ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড রাইট শেয়ার ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিটি ১:৩ হিসাবে অর্থাৎ বিদ্যমান তিনটি শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার ইস্যু করবে। জিপিএইচ ইস্পাত ১৫ টাকা দরে রাইট শেয়ার ইস্যু করবে। অর্থাৎ ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ৫ টাকা প্রিমিয়াম থাকবে। কোম্পানিটি ১৬ কোটি ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮৫টি রাইট শেয়ার ইস্যু করে ২৪১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করবে। রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ কোম্পানির সম্প্রসারিত কারখানার জন্য ফার্নেস সংস্থাপনে ব্যয় করা হবে, যা কোম্পানিটির উৎপাদনক্ষমতা বাড়াবে। কোম্পানিটির গত আগস্ট মাসে এক মূল্যসংবেদনশীল তথ্যের মাধ্যমে এ তথ্য জানা গেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আরও ৫০০ কোটি টাকা বন্ডের মাধ্যমে উত্তোলনের ঘোষণাও দেয়। সর্বশেষ শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠানটি হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়টিও পর্যালোচনা করছে।
আর্থিক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩-২৪ হিসাববছরের জন্য ১০ শতাংশ নগদ (উদ্যোক্তা পরিচালক বাদে) লভ্যাংশ ঘোষণা দিয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত। আর চলতি ২০২৪-২৫ হিসাববছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে জিপিএইচ ইস্পাতের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৬৫ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে যেখানে শেয়ারপ্রতি হয়েছিল ৩২ পয়সা। গত ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়ায় ৫২ টাকা ৭১ পয়সা।
পরিশোধিত মূলধনের ১১ গুণের বেশি দেশি ও বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ। এ বিষয়ে জানার জন্য প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও ব্যবসা উন্নয়ন) কামরুল ইসলাম এফসিএর সঙ্গে শেয়ার বিজ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন। পরে এ বিষয়ে কথা বলি। পরে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবহƒত ফোনে যোগাযোগ করা হলে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, আমি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি সভায় আছি। শেষ করে আপনাকে রিং ব্যাক করব। বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ, ২০১২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জিপিএইচ ইস্পাতের অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৪৮৩ টাকা। রিজার্ভে রয়েছে এক হাজার ৯২২ কোটি টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৪৮ কোটি ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৫৬। এর মধ্যে ৪১ দশমিক ৪৯ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালক, ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বাকি ৩৯ দশমিক ২০ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ডিএসইতে বৃহস্পতিবার জিপিএইচ ইস্পাত শেয়ারের সমাপনী দর ছিল ২১ টাকা। গত এক বছরে শেয়ারটির দর ১৯ টাকা ২০ পয়সা থেকে ৩৩ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করেছে।




