Print Date & Time : 30 August 2025 Saturday 12:46 pm

নিরীক্ষকের প্রশ্নের মুখে পড়েছে পিছিয়ে পড়া প্রগ্রেসিভ লাইফ

মো. রাহাতুল ইসলাম : ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়া, মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব-মামলা, লাইফ ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগ, লভ্যাংশ দিতে না পারা আর বিমা দাবি পরিশোধ নিয়ে বিতর্কে রয়েছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। কিন্তু আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের সামনে আসেনি। ২০২৩ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের বিষয়ে নিরীক্ষকের আপত্তির জেরে ফের প্রশ্নের মুখে প্রগ্রেসিভ লাইফ। আবারও কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন সীমা লঙ্ঘন, দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা আর জমি-ভবনে বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে আলোচিত হচ্ছে জমি-ভবনে বিনিয়োগ করেও দীর্ঘদিন মালিকানা না পাওয়া। নিরীক্ষকের আপত্তিতে বলা হচ্ছে, প্রগ্রেসিভ লাইফ বিনিয়োগের তালিকায় রাজধানীর আফতাবনগরে প্রায় ২০ কাঠা, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের দুটি স্থানে প্রায় ৩৬ কাঠা জমি দেখিয়েছে। যেগুলোয় কোম্পানিটির বিনিয়োগ প্রায় ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। একইভাবে রাজধানীর বিজয়নগর, চট্টগ্রাম শ্রীমঙ্গলে ভবনের ফ্লোর স্পেস কিনতে প্রায় ১৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে কোম্পানিটি। কিন্তু এসব সম্পদে বিনিয়োগ করলেও বিভিন্ন কারণে সেগুলোর মালিকানা পায়নি প্রগ্রেসিভ লাইফ। যে কারণে প্রায় ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ ও কাগজে-কলমে থাকা সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে প্রগ্রেসিভ লাইফের সম্পদের বিনিয়োগসহ বেশকিছু বিষয়ে বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও (বীউনিক) এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এরপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কোম্পানিটিকে আইন মেনে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও বিষয়গুলো সুরাহা হয়নি।

একইভাবে প্রগ্রেসিভ লাইফের পরিশোধিত মূলধন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বিমা আইনে ৩০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ হিসেবে কোম্পানিটি বিদ্যমান আইন মানতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আপত্তি নিরীক্ষকের।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ের অনিষ্পন্ন বিমা দাবির সংখ্যা ৪৭ হাজার ৭২৬টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব দাবির বিপরীতে গ্রাহকদের পাওনা প্রায় ৮৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এতে একদিকে তিন বছরেও বিমা দাবির টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। অন্যদিকে লঙ্ঘিত হচ্ছে বিমা আইন, আইনে দাবি উত্থাপনের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে তা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রগ্রেসিভ লাইফের গ্রাহকের প্রিমিয়ামের অর্থ বিনিয়োগ করেও সেই সম্পত্তির মালিকানা না পাওয়া, বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা ও পরিশোধিত মূলধনের শর্ত পূরণসহ ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুল আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা সংকটগুলো সমাধানের জন্য কাজ করছি। ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকা, সম্পত্তির মালিকানার জটিলতা নিরসন ও বিমা দাবি পরিশোধের ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, সময় লাগলেও আমরা বিষয়গুলো সমাধান করতে পারবো।’

এদিকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরাও প্রগ্রেসিভ লাইফের শেয়ার নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। আইনি জটিলতায় এজিএম করতে না পারায় ২০২১ সাল থেকে বিনিয়োগকারীদের কোনো দেয়নি প্রগ্রেসিভ লাইফ। ২০২০ সালের জন্য মাত্র দুই দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। এর আগে প্রায় ছয় বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৯ সালে এজিএম করেছে কোম্পানিটি। সেই সময় প্রতি বছরের জন্য গড়ে সাড়ে ১২ শতাশ পাঁচ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। অনিয়মিত এজিএম ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করায় কোম্পানিটির অবস্থা সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
জীবন বিমা খাতের কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ৭৫ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট এক কোটি ৬৬ লাখ শেয়ারের অর্ধেকই এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে প্রগ্রেসিভ লাইফের ১৮ দশমিক ৫১ শতাংশ শেয়ার ছিল; যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে। একইভাবে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে থাকা শেয়ারের সংখ্যাও কমেছে।