কাজী সালমা সুলতানা: শুভ জন্মদিন শেখ রাসেল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল। বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হতো ৫৮ বছর । ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে রাত দেড়টায় রাসেলের জন্ম। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচার বাসায়। বড় ফুফু ও মেঝ ফুফু মায়ের সঙ্গে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেঝ ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড় সড় হয়েছিল রাসেল।’ রাসেলের যেদিন জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেয়ার জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন।
শেখ রাসেলের জন্ম নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে সে কী উত্তেজনা! রাসেলের জন্মের আগে দুই বোন ভেবেছিলেন, বোন হলে তারা দলে ভারী হবেন। আর ভাইয়েরা ভেবেছিলেন ভাই হলে তাদের দল ভারী হবে। এই নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে যেন পাল্লা লেগে গিয়েছিল। সবাই ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে থাকে নতুন অতিথির আশায়। অপেক্ষার পালা শেষ হলো। খবর এলো তাদের ভাই হয়েছে, তখন সব কিছু ভুলে সবাই আনন্দে আত্মহারা। মাথাভরা কালো চুল, তুলতুলে শরীর, অপূর্ব মুখচ্ছবি। অনেক বছর পর ছোট্ট একটি শিশু তাদের ঘর আলো করে এসেছে। সবার মধ্যে যেন খুশির জোয়ার বইতে থাকে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন। রাসেলের বই পড়ে তিনি তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা রেণুকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। তা শুনে শুনে রেণু এতটাই বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তার নাম অনুসারে নিজের ছোট ছেলে জন্মের পর তার নাম রাখলেন রাসেল। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে রাসেল সবার ছোট। মা-বাবা-ভাই-বোন সবার বড় আদরের রাসেল বুদ্ধিদীপ্ত চোখের চাওয়া আর মিষ্টি হাসি নিয়ে দিনে দিনে সে বড় হতে থাকে।
শৈশবে রাসেলের দুরন্তপনার মাঝেও মায়ের শিক্ষায় তার মানবীয় গুণাবলি ছড়িয়ে পড়ে। বাড়ির কাজের ছেলে আব্দুল মিয়াকে ‘ভাই’ বলে ডাকত। কবুতর খুব পছন্দ ছিল তার। সে যখন সবে হাঁটতে শিখেছে, তখনই কবুতরের পেছনে পেছনে ছুটেছে। টুঙ্গিপাড়ায় তাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল। সকালে নাশতার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা পরিবারের সবার প্রিয় খাবার হলেও রাসেল কোনো দিন কবুতরের মাংস খেত না। রাসেলের মাছ ধরারও খুব শখ ছিল। তবে মাছ ধরার পর আবার তা ছেড়ে দিতেই সে বেশি মজা পেত। একবার পরিবারের সবার সঙ্গে রাসেল নাটোরে উত্তরা গণভবনে গিয়েছিল। সেখানেও সারা দিন সে মাছ ধরা আর ছাড়াতেই ব্যস্ত ছিল। রাসেলের খুব ইচ্ছা ছিল সে বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। তাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, ‘বড় হয়ে তুমি কী হবে?’ সে নির্দ্বিধায় বলত, ‘আমি আর্মি অফিসার হব।’
কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।’
বড় দুই ভাই একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাদের কাছ থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে যুদ্ধের গল্প শুনত রাসেল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন পুলিশের গাড়ি দেখলেই বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রাসেল চিৎকার করে বলত, ‘ও পুলিশ-হরতাল।’ হরতাল হরতাল বলে চিৎকার করে সেøাগান দিত ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা।’
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পরিবারের সবার সঙ্গে ছোট্ট রাসেলকেও বন্দি জীবনযাপন করতে হয়। ঠিকমতো খাবারদাবার নেই। কী কষ্টে যে দিন কেটেছে রাসেলের! চোখের কোণে সব সময় পানি। যদি জিজ্ঞেস করা হতো, কী হয়েছে রাসেল? জবাব দিত, চোখে ময়লা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে শেখ রাসেল সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, “অবাক লাগত এতটুকু শিশু কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল।’ তিনি লিখেছেন, ‘রাসেল অত্যন্ত মেধাবী ছিল। পাকসেনারা তাদের অস্ত্র পরিষ্কার করত, ও জানালায় দাঁড়িয়ে সব দেখত। অনেক অস্ত্রের নামও শিখেছিল। যখন এয়ার রেইড হতো, তখন পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে যেত আর আমরা তখন বারান্দায় বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। আকাশের যুদ্ধবিমানের ‘ডগ ফাইট’ দেখারও সুযোগ পেতাম। প্লেন দেখা গেলেই রাসেল খুব খুশি হয়ে হাতে তালি দিত।” শৈশবেই তার মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত ছিল।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশ মুক্ত হলেও বঙ্গবন্ধুর পরিবার সেদিনও মুক্ত হতে পারেনি। তারা মুক্তি পেয়েছিলেন ১৭ ডিসেম্বর সকালে। বিজয়ের উল্লাসে উদ্বেলিত শিশু রাসেল। কিন্তু তার দুটি চোখ যেন তার বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যেদিন বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন, রাসেলের আনন্দ যেন আর ধরে না। সে এক মুহূর্তের জন্যও বাবাকে কাছ ছাড়া করতে চাইছিল না। কী যে আনন্দ তার চোখে-মুখে! ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই বড় ভাই শেখ কামালের এবং ১৭ জুলাই শেখ জামালের বিয়ে হয়। এই বিয়েতে বাইরের চাকচিক্য না থাকলেও আত্মীয়স্বজনে মিলে সবাই খুব আনন্দ করে। বিশেষ করে রাসেল সমবয়সীদের সঙ্গে মিলে রং খেলে, খুব মজা করে।
ছোটবেলা থেকেই সে বুঝতে শিখেছে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে চায়; কিন্তু পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বীর বাঙালি যুদ্ধ করে বাংলার স্বাধীনতা এনেছে। একবার রাসেলকে একটি বড় কালো পিঁপড়া কামড়ে দিলে তার আঙুল কেটে রক্ত বের হয়। এরপর ওই কালো পিঁপড়া দেখলেই রাসেল তাকে ভুট্টো ডাকত।
নির্মল প্রাণবন্ত রাসেলের স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার; কিন্তু সব কিছুই স্তব্ধ করে দেয় মানবরূপী দানব। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাকেও প্রাণ দিতে হলো। রাসেলকে মা-বাবা-ভাই-ভাবি-চাচা সবার নিথর দেহের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে দোতলায় নিয়ে যায় নরপশুরা। তারা শিশু রাসেলকে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি।
ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে দুরন্ত ১১ বছরের রাসেল নিথর হয়ে পড়ে ছিল। তখন সে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল।
আজ রাসেল আমাদের মাঝে নেই। তবুও আছে এ দেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে। মানুষের ভালোবাসার মাঝে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে শেখ রাসেল। আজ তার জন্মদিনে গভীর আবেগ তাকে স্মরণ করি। সেই সঙ্গে প্রতিটি শিশুর কল্যাণ ও নিরাপদ নির্মল জীবন হোক, এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।
লেখক, সাংবাদিক
salma15august@gmail.com
