Print Date & Time : 29 August 2025 Friday 11:03 pm

নেপথ্যের খলনায়ক আর্থিক খাত ও রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে চলমান অর্থনৈতিক চাপের পেছনে আর্থিক খাতকে খলনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতির বর্তমান চাপ তৈরি হয়নি। মূলত এ চাপ তৈরি হয়েছে দীর্ঘ দিনের আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণের আওতা না বাড়ানোরই কারণে। এর পাশাপাশি নতুন করদাতা সৃষ্টি করণে না পারাসহ কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করেছেন তিনি।

গতকাল সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট নিয়ে ‘বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একটি উত্তরণকালীন নীতি সমঝোতা খসড়া’ শীর্ষক আলাপচারিতায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ রোগের একটি উপসর্গ মাত্র। আসল রোগ হলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের যথাযথ সংস্কার না করা। আর্থিক খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখন ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে। অথচ এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গরিব মানুষকে সুরক্ষা দিতে ভর্তুকি দেয়া বেশি প্রয়োজন ছিল। যদি আমাদের সক্ষমতা থাকত অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আয় বেশি থাকতো তাহলে ভর্তুকি না কমিয়ে সমন্বয় করা যেত।

এ সময় তিনি কিছু সুপারিশও দেন। সুপারিশগুলো হলোÑ আর্থিক খাতের সংকট মোকাবিলায় দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা প্রণয়ন করা। এই নীতি সমঝোতায় নীতি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া সুপারিশ হিসেবে তিনি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা এবং গরিব মানুষকে সুরক্ষা দেয়ার কথা উল্লেখ করেন। নীতি প্রণয়নে ঐকমত্যে থাকার কথা বলেছে তিনি। যাতে করে আগামীতে যদি রাজনৈতিক টানাপড়েন হয়, তখনও আর্থিক খাতকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ডলারের দাম উঠবে কি না, সরকার ভর্তুকি দিতে পারবেন কি না এটা বহিঃখাতের ব্যাপার না। এটা আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপার। সরকার কী পরিমাণ রাজস্ব আয় করেছে, কোথায় কী ব্যয় করেছে, কোথায় কী পরিমাণ ব্যবস্থাপনা করেছেÑ সেটিই মুখ্য বিষয়। টাকা কোথায় কীভাবে উঠবে সেটি না করে আমরা যদি বাংলাদেশ ব্যাংক আর ব্যাংকের ট্রেজারি অপারেশনের ভেতরে থাকি তাহলে আমরা শুধু রোগের উপসর্গের পেছনে দৌড়াব। রোগের কারণটাকে ধরতে পারব না। তিনি আরও বলেন, বহিঃখাতে নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে তার অন্যতম কারণ তুলনামূলকভাবে বহিঃখাতের তথ্য উপাত্ত বেশি পাওয়া যায়। আর্থিক খাতের তথ্য উপাত্তে সে অনুপাতে পাওয়া যায় না। আপনি এখনও মে মাসের আগের সরকারি ব্যয়ের হিসাব পাবেন। আপনি এখনও জুন মাসের কর আহরণের হিসাব পাবেন না। সে জন্য ওখানে আলোচনাটা কম। যেহেতু বৈদেশিক খাতে দৈনন্দিন তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায়, তাই এখানে আলোচনা বেশি।

তিনি বলেন, বাজেটের পর অর্থনীতি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। অনেকে বলছেন বৈশ্বিক কারণে এই পরিস্থিতি। আমি তাদের সঙ্গে আংশিক একমত হয়ে বলছি, শুধু বৈশ্বিক কারণে বললে এক ধরনের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দেয়া হবে। অর্থনীতির মূল ফুসফুস হলো আর্থিক খাত। বর্তমানে যে আর্থিক কাঠামো এবং সরকারের খরচ করার যে সক্ষমতা, তা উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে সমর্থন দেয়ার মতো নয়। সরকার এখন আর্থিক সম্পদ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ভর্তুকি কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ সরকারের আর্থিক সামর্থ্য থাকলে জ্বালানি তেলের এত উচ্চ হারে দর বাড়িয়ে মানুষকে কষ্টে ফেলতে হতো না। তিনি আরও বলেন, ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। সার, বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসে ভর্তুকি দরকার। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জের নামে যে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে সেটা খারাপ ভর্তুকি। জ্বালানি তেলের ভর্তুকি কমিয়ে বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া ভুল পদক্ষেপ।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে শুধু তা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে মোকাবিলা করা যাবে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। বৈশ্বিক পরিস্থিতি সব দেশকে আঘাত করেছে। কিন্তু অনেকেই এই পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারছে না। আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, এখন যদি আমাদের কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশ থাকত তাহলে বর্তমানের এত চাপ তৈরি হতো না।

তিনি বলেন, আমরা দেখছি বর্তমানে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশে দরিদ্র সরকার দেশ চালাচ্ছে। গত দশ বছরে নিজের আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত না করার কারণেই অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যার অনিবার্য পরিণতি ভোগ করছে দেশ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক এই দুর্যোগ থাকতে পারে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি, টাকার ওপর চাপ, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন প্রকল্প এসব বিষয়ে যেসব সমস্যা চলছে তা ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে।

এ সময় সরকার নিজের ভেতরেই অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে না বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, সরকার তার নিজের ভেতরেই চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা করে না। সংসদসীয় স্থায়ী কমিটি কোথায় তাদের ভেতর আলোচনা কই? সরকার বাইরে আলোচনার আগে তাদের ভেতরে মন্ত্রিসভা, সংসদে আলোচনা করুক। সরকার তার রাজনৈতিক সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করুক। বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করুক। সরকার শুধু নামে থাকলে হবে না। সরকারের প্রতি জনমনে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে। জনগণ সরকারকে আস্থায় নিচ্ছে না, সেজন্যই আলোচনা প্রয়োজন।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে এত পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য খারাপ দিক। সঠিক বিবেচনা না করেই মূল্য বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি খাতে যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এতে সরকারের এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কোনো ভূমিকা দেখি না। যে ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে, আবার আগের যে উদ্বৃত্ত ছিল এসব নিয়ে সরকার কোনো পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে না। সবমিলিয়ে কোনো স্বচ্ছতার মধ্যে নেই। যদি একটা কার্যকর সংসদ থাকত তাহলে একজন সংসদ প্রশ্ন তুললে মন্ত্রীকে সব জবাব দিতে হতো।

আইএমএফের ঋণ পাওয়ার পূর্বশত হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কেউ যদি বলেন, আইএমএফের শর্তে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর মানে, দেশ নীতি সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলেছে। কোনো সরকারের জন্য এটি সম্মানজনক নয়। তবে এই ধরনের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু প্রাক-পদক্ষেপ নেয়া হয়। এই সময়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপের উদাহরণ দেন।