ডিএসইর সাপ্তাহিক চিত্র

‘পর্যবেক্ষণ’ ও ‘বিক্রয়’ নীতি অবলম্বনেই পতন

মো. আসাদুজ্জামান নূর: বড় দরপতন দিয়ে গত সপ্তাহ পার করেছে দেশের পুঁজিবাজার। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন সপ্তাহের পতনে ২৮ হাজার কোটি টাকা বাজার মূলধন হারিয়েছে ডিএসই। একই সঙ্গে কমেছে সব মূল্যসূচক ও লেনদেনের পরিমাণ।

সপ্তাহের শুরুতে এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধন ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। সপ্তাহ শেষে যা কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায়। ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে ১১ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মার্জিন ঋণ সমন্বয় কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে বড় পতন হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট কেন্দ্র করে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে গ্যাস ও গমের দাম বৃদ্ধি সম্ভাবনা অর্থনৈতিক মন্দা বয়ে আনতে পারে, এমন আশঙ্কা পুঁজিবাজারকে নেতিবাচক দিকে পরিচালিত করেছে। এসব অস্থিরতায় দ্বিধায় ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। এ সময় দুটি নীতিতে লেনদেন করেছেন তারা। প্রথমত, অনেকে ‘সাইডলাইনে’ থেকে বাজার পর্যবেক্ষণ করেছেন। কয়েকদিন দেখে বিনিয়োগে ফিরবেন। দ্বিতীয়ত, অনেকে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির চেষ্টায় ছিলেন। ফলে এই ‘পর্যবেক্ষণ’ ও ‘বিক্রয়’ নীতি এমন পতন ডেকে এনেছে।

তবে পুঁজিবাজারের পতনের পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যু বড় কারণ নয় বলে জানিয়েছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যাতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এমন বড় পতন ঘটতে পারে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পতনের পেছনে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বড় কারণ নয়। এই যুদ্ধের ফলে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। এমনকি যুদ্ধ এমন পর্যায়েও যায়নি যে, ইউরোপের অর্থনীতিতে খুব বেশি খারাপ প্রভাব ফেলেছে। যদি এমন হতো তাহলে সেটা হয়তো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারতো এবং পুঁজিবাজার পতনের বড় কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতো।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে ওঠানামা করে না। যখন অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ভালো অবস্থানে থাকে তখনও পুঁজিবাজার নেতিবাচক দেখা যায়, আবার যখন অর্থনীতির সব সূচক খারাপ অবস্থানে থাকে তখন পুঁজিবাজারের সূচক বাড়ে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, কভিডকালে যখন সব অর্থনৈতিক সূচক মন্দা ছিল তখন পুঁজিবাজার চাঙা ছিল।

গত সপ্তাহে বড় পতনের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের খবরটি কাজে লাগিয়ে বাজার কিছুটা নামানো হয়েছে। যাতে বড় বিনিয়োগকারীরা বা যারা বড় ফান্ড হোল্ড করেন তারা কম দামে আরও শেয়ার কিনতে পারেন।

লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচিত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইতে মোট তিন হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। যেখানে আগের সপ্তাহে লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে এক্সচেঞ্জটিতে লেনদেন কমেছে ২৪২ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। দৈনিক গড়ে লেনদেন হয়েছে ৭৪৯ কোটি টাকা। যেখানে আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৯৯৭ কোটি টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে গড় লেনদেন কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

খাতভিত্তিক লেনদেনে শীর্ষে ছিল বিবিধ খাত। এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল খাতটির দখলে। ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বস্ত্র খাত। ওষুধ ও রসায়ন খাত ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ে লেনদেন তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। পরের অবস্থানে থাকা প্রকৌশল খাতের দখলে ছিল মোট লেনদেনের ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। পঞ্চম স্থানে থাকা ব্যাংক খাতের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

ডিএসইতে গত সপ্তাহে বেশিরভাগ খাতে নেতিবাচক রিটার্ন এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণাত্মক রিটার্ন এসেছে সিরামিক খাতে, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ৫ দশমিক ৭ শতাংশ নিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিমেন্ট খাত। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, সেবা খাত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, টেলিকম খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ও প্রকৌশল খাতে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করে ঋণাত্মক রিটার্ন এসেছে।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৩৯১টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ৫৫টির। কমেছে ৩১৯টির। আর অপরিবর্তিত ছিল ১২টির। লেনদেন হয়নি ৫টির। সেই হিসাবে মোট সিকিউরিটিজের ৮০ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে। আর দর বেড়েছে মাত্র ১৪ শতাংশের। তবে দর বৃদ্ধির তালিকায় থাকা বেশিরভাগ জাঙ্ক শেয়ার। ব্যবসায়িক ও আর্থিক দিক থেকে দুর্বল অবস্থায় থাকা কোম্পানির শেয়ার জাঙ্ক হিসেবে পরিচিত। বাজার নি¤œমুখিতার মধ্যেও গত সপ্তাহে দর বৃদ্ধিতে এসব শেয়ারেরই আধিক্য ছিল। আলোচিত সময় মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, সাভার রিফ্র্যাক্টরিজ, জিল বাংলা সুগার মিলস, ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ, জুট স্পিনার্স, উসমানিয়া গ্লাস, ফারইস্ট লাইফ, মোজাফফর হোসেন স্পিনিংয়ের মতো শেয়ারের দর বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে ডিএসইতে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদর কমে যাওয়ার কারণে সূচকে বড় পতন হয়েছে। এর মধ্যে ডিএসইর সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় ১৪৩ পয়েন্ট বা ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কমে ৬ হাজার ৬৯৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আগের সপ্তাহ শেষে যা ছিল ৬ হাজার ৮৩৯ পয়েন্টে। সূচকের পতনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্র্যাক ব্যাংক, গ্রামীণফোন, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, বিকন ফার্মা, অলিম্পিক ও আইএফআইসির শেয়ার।

অন্য সূচকের মধ্যে ডিএসইর নির্বাচিত কোম্পানির সূচক ডিএস৩০ সপ্তাহের ব্যবধানে ৫২ পয়েন্ট বা ২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ কমে ২ হাজার ৪৬৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে যা ছিল ২ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে। শরিয়াহ্ সূচক ডিএসইএস প্রায় ৩৪ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ১ হাজার ৪৪২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে যা ছিল এক হাজার ৪৭৬ পয়েন্টে। এদিকে শিগগির বাজার ভালো অবস্থানে ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজের সাবেক প্রধান নির্বাহী (সিইও) সাইফুল ইসলাম বলেন, কভিড সংক্রমণ প্রায় জিরো পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বেড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কমে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারে ফিরবেন এবং বাজার ঊর্ধ্বমুখী হবে বলে আশা করা যায়।