শেয়ার বিজ ডেস্ক: মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে ২০১১ সালে মিসরের সড়কে জনতার ঢল নামে। জনতা বিক্ষোভ শুরু করেন রুটির জন্যও। আকাশচুম্বী দাম হয় নানা ধরনের খাদ্যপণ্যের এবং প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন জনসাধারণ।
এর প্রায় এক দশক পর, বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম আবার বেড়েছে। কভিড-১৯ মহামারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে খাদ্যের দাম। উপরন্তু খারাপ আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে, যাতে খাদ্যঝুঁকিতে রয়েছেন বিশ্বের লাখো মানুষ। এর ওপর শুরু হয় ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, যা পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গীন করে তোলো। এ যুদ্ধের কারণে খাদ্যের পাশাপাশি অন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ জ্বালানি তেলের দাম লাগামছাড়া হয়ে গেছে। এই দুই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জোগান ঠিক রাখতে দিশাহারা অনেক সরকার। রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হতে পারে দেশগুলোয়। কেননা সরকার দ্রব্যমূল্যের রাশ টেনে ধরতে না পারায় ক্ষোভে ফুঁসছে জনগণ। পাকিস্তান থেকে পেরুÑসবখানেই একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খবর: সিএনএন।
বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের সিনিয়র ফেলো ও আফ্রিকান আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ রাবাহ আরেজকি।
শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও পেরুতে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। শ্রীলঙ্কায় গ্যাস, ডিজেল ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের হাহাকার চলছে। পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি দুই সংখ্যা পেরিয়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। পেরুতে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঘটে যাওয়া সহিংসতায় অন্তত ছয়জন মারা গেছেন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শুধু এই দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
গ্লোবাল রিস্ক কনসালটেন্সি ফার্ম ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিশ্লেষক হামিশ কিনিয়ার বলেন, আমার
মনে হয় না মানুষ এখনও মূল্যস্ফীতির প্রভাব বুঝতে পারছেন।
আরব বসন্ত থেকে শিক্ষা নেয়নি সরকার। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০১০ সালের শেষের দিকে তিউনিশিয়ায় শুরু হয়ে এ আন্দোলন ২০১১ সালের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য মূল্য সূচক অনুযায়ী, ২০১০ সালে সূচক বাড়ে ১০৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় রেকর্ড ১৩১ দশমিক ৯ শতাংশে।
তিউনিসিয়ার ফেরিওয়ালা মোহাম্মদ বুয়াজিজি বেকারত্ব ও ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে প্রকাশ্যে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। শুরু হয় আরব বসন্ত। বর্তমানে অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতি কমবেশি একই ধরনের। গমের দাম বেড়ে যাওয়াকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে; বরং সেই সময়ের চেয়ে এখনকার অবস্থা আরও শোচনীয়। বৈশ্বিক পর্যায়ে খাদ্যের দাম রেকর্ড বেড়েছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত এফএও’র খাদ্য মূল্য সূচকে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে খাদ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। এ সময় খাদ্যের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানায় সংস্থাটি। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাজুড়ে এরই মধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ইউক্রেনে উৎপন্ন ৪০ শতাংশ গম ও ভুট্টা রপ্তানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোয়। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ না থাকায় দেশগুলোয় খাদ্য সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে।
শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও পেরুর পাশাপাশি দুশ্চিন্তা বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোয়। বিশেষ করে লেবানন, মিসর, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান ও বুরকিনা ফাসোর খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানায় রেড ক্রস। ইউরোপের গ্রিস ও ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে মজুরি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। তাই ফরাসি প্রেসিডেন্ট মধ্য ও নি¤œবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য ফুড ভাউচার ইস্যু করার পরিকল্পনা করছেন।