পাহাড়তলী হাজি ক্যাম্প চালুর উদ্যোগ নিন

মাহমুদুল হক আনসারী: চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী হাজি ক্যাম্প এখন স্থানীয় বখাটে ও মাদকসেবীদের অভয়াশ্রম। এক সময় হাজারো হাজিদের পদচারণায় মুখর ছিল এ হাজি ক্যাম্প। ১৯৫১ সালে প্রথম হজযাত্রা শুরু করেন হাজিরা এই হাজি ক্যাম্প থেকে। ১৯৮৪ সালে জাহাজের পাশাপাশি বিমানে যাত্রী পাঠানো হতো এই হাজি ক্যাম্প থেকে।

এরপর ১৯৮৫ সালে হজযাত্রা বন্ধ হয়ে গেলে অকেজো হয়ে পড়ে এই হাজি ক্যাম্পটি, পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ভবনগুলোর অবকাঠামো। দিন দিন হয়ে ওঠে মাদকসেবীদের আস্তানা হিসেবে। ভুতুড়ে নগরে পরিণত হয়ে এই হাজি ক্যাম্পখানা।

এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, এখানে মদ গাঁজা ইয়াবাসহ সব অপরাধ কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। মাদক সেবন এবং দিনের বেলায় জুয়ার আসর বসানো হয় এই হাজি ক্যাম্পে এবং রাতের বেলায় পতিতারা পতিতাবৃত্তি করেন এই হাজি ক্যাম্পে। এলাকাবাসীর দাবি এই হাজি ক্যাম্পকে আগের মতো রূপ দান করে সংস্কার করে এখান থেকে যেন হাজিদের হজ পালনের জন্য পুনরায় হাজি ক্যাম্পটি চালু করা হয়। এলাকার পরিবেশ সুষ্ঠু, সুন্দর করে, মাদকসেবী ও সন্ত্রাসীদের আস্তানা যেন ধ্বংস করা হয়।

এই চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী হাজি ক্যাম্প ৯.৩৫ একর জায়গাজুড়ে পাহাড়তলী হাজি ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়। ১৯৫০ সালে ১৪ লাখ টাকা ব্যয় করে হাজি ক্যাম্পের সাতটি ব্লগ নিয়ে যাত্রা শুরু। ক্যাম্পের ক্ষমতা ছিল ৫ হাজার হজযাত্রীর ধারণক্ষমতা।

চট্টগ্রাম বিভাগের হজযাত্রীদের জন্য নগরীর পাহাড়তলীস্থ দেশের প্রথম হাজি ক্যাম্প পুনরায় চালু করা, হাজি ক্যাম্পের ব্যবহারযোগ্য ভবনগুলোর সংস্কার এবং ক্যাম্পে একটি আধুনিক সম্মেলনকেন্দ্রসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নীতিগত প্রাক-সম্মতি প্রদান করেছেন বলে জানা যায়। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ অফিসের সহকারী হজ কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক বরাবরে প্রেরিত চিঠির অনুলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ৬৫ বছরের প্রাচীন চট্টগ্রাম হাজি ক্যাম্প ৯.৩৫ একর সম্পত্তির ওপর স্থাপিত। এর মধ্যে এক একর জায়গা ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে হস্তান্তর করা হয়েছে। চট্টগ্রাম হাজি ক্যাম্প বর্তমানে সম্পূর্ণ ব্যবহার অযোগ্য। মসজিদ ও ২টি পিলগ্রিম (হজযাত্রী) ভবন ছাড়া অবশিষ্ট সব অবকাঠামো অনেক আগেই গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ২টি পিলগ্রিম ভবন সংস্কার করে মুদ্রণসামগ্রীর আঞ্চলিক অফিস ও যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কর্তৃক ভাড়ায় ব্যবহƒত হচ্ছে। এ ভবন দুটির অবস্থাও জরাজীর্ণ। এ ক্যাম্প ব্যবহার করে হজযাত্রী প্রেরণ করতে হলে কেবল মসজিদ ছাড়া সবগুলো অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করার প্রয়োজন হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাজি ক্যাম্পের অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রণয়ন প্রস্তাব প্রেরণের নির্দেশনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম পাহাড়তলী হাজি ক্যাম্পের বিভিন্ন দালানের সংস্কার ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য গণপূর্ত ও স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক চট্টগ্রাম হাজি ক্যাম্প পরিদর্শনপূর্বক অনুমোদিত নকশা ও সঠিক স্থানিক নকশা প্রণয়ন করে শিগগিরই চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ ও হজ অফিস ঢাকাকে সরবরাহ করার জন্য বলা হয়েছে।

এ উপমহাদেশে ইসলামের প্রাচীনকাল থেকে হজ কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্রসিদ্ধ প্রথমে ভারতের মুম্বাই, এরপরই চট্টগ্রামের অবস্থান। মুম্বাইর পাশাপাশি চট্টগ্রামও হজ কার্যক্রম নিয়ে গর্ব করতে পারে। তার মূলে ভৌগোলিক অবস্থান, কর্ণফুলী নদী ও প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বের কাছে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর। আরবীয়রা হলেন বণিক পেশার লোক। প্রাচীনকাল থেকে দূরত্বের যোগাযোগে সাগর-মহাসাগর ছিল অন্যতম মাধ্যম। ফলে আরবের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের যোগাযোগ সেই প্রাচীনকাল থেকেই। সাহাবা, তাবেঈন, তবে তাবেঈন,  পরবর্তী যুগে নব-দীক্ষিত মুসলমানরা পালতোলা জাহাজে করে চট্টগ্রাম থেকে হজে গমন করতেন।

দিল্লির সুলতানি আমল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পালতোলা জাহাজে করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রী পরিবহনের কথা জানা যায়। ওই সময় বাংলার রাজধানী সোনারগাঁওয়ের সুলতান ছিলেন গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ। বিহারের বিখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হজরত মোজাফফর শাহ্ বলখী (হজরত ইয়াহিয়া মানেরীর অন্যতম খলিফা) সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের কাছে চিঠি লিখেন তাকে যেন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে হাজিদের প্রথম জাহাজে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ওই সময় বাংলার অপর দুই বিখ্যাত শহর ঢাকা ও কলকাতার অস্তিত্ব ছিল না। ঢাকা প্রতিষ্ঠা লাভ করে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে। অপরদিকে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক কলকাতা নগরী প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বিভাগে বর্তমানে হজযাত্রী সংখ্যা ২৬ শতাংশ। দেশের মূল কোটার ৪ ভাগের ১ ভাগ চট্টগ্রাম বিভাগের। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ঐতিহ্যবাহী হাজি ক্যাম্পটি ফের চালু হলে এ অঞ্চলের হাজিরা উপকৃত হবেন। এ বিভাগের হাজিদের ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি না করে চট্টগ্রাম-পাহাড়তলী হাজি ক্যাম্পের মাধ্যমে হজের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা সহজতর হবে।

ফ্রিল্যান্স লেখক