নিজস্ব প্রতিবেদক: অবসায়নের (বন্ধ) সিদ্ধান্ত হওয়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের সঙ্গে কোনো লেনদেন না করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. আসাদুজ্জামান খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আদালতের নির্দেশে তাকে পিপলস লিজিং অবসায়নের জন্য অবসায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন বন্ধ করতে হবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এটি বলবৎ থাকবে। আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের হিসাব পাওয়ার পরই অবসায়নের কার্যক্রম শুরু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোন পদ্ধতিতে অবসায়ন শুরু হবে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। এর আগে এ রকম কোনো নজির না থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে।
পিপলসের সম্পদ বিক্রি ও অর্থ আদায় করেই আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়েছে, আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশে প্রথমবারের মতো কোনো ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত পিপলস লিজিং অবসায়নের নির্দেশ দেন। একই আদেশে আদালত পিপিলস লিজিংয়ের সঙ্গে একসময় সম্পৃক্ত ৯ পরিচালকের সব ধরনের ব্যাংক হিসাব ও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের মালিকানা জব্দ করার নির্দেশ দেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী অনিয়মের মাধ্যমে ৫৭০ কোটি টাকা বের করে নেন পরিচালকরা। এর বড় অংশই উত্তোলন করা হয় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শামসুল আলামিন গ্রুপের নামে। গ্রুপের ২০ প্রতিষ্ঠান ও কয়েকজন পরিচালকের নামে অনিয়ম করে তোলা হয় প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। এছাড়া পরিচালক মতিউর রহমান, খবির উদ্দিন, ইউসুফ ইসমাইল ও বিশ্বজিৎ কুমার রায় নামে-বেনামে অর্থ উত্তোলন করেন।
পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান এম মোয়াজ্জেম হোসেন প্রতিষ্ঠানটির ১২৩ কোটি টাকার জমি নিজের নামে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করে নিলেও পরে তা ছেড়ে দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব অনিয়ম উঠে আসার পর প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরিচালক শামসুল আলামিন, নার্গিস আলামিন, হুমায়রা আলামিন ও খবির উদ্দিনকে অপসারণ করা হয়। আর চেয়ারম্যান এম মোয়াজ্জেম হোসেন স্বেচ্ছায় পদ ছেড়ে দেন।
পিপলস লিজিংয়ে ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির ঝুঁকি ও তারল্য সংকটে দুরবস্থা রয়েছে। তারা আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক তথ্যানুযায়ী, পিপলস লিজিংয়ে আমানত রয়েছে দুই হাজার ৮৬ কোটি টাকা। তবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার মতো নগদ অর্থ সংকটে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় মতিঝিলে। এছাড়া গুলশান ও চট্টগ্রামে দুটি শাখা রয়েছে। পিপলস লিজিংয়ে এক হাজার ১৩১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ৭৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। সর্বশেষ শেয়ারটির দর নেমে দাঁড়িয়েছে তিন টাকায়।




