মো. আসাদুজ্জামান নূর: আগের সপ্তাহের মতো সদ্য বিদায়ী সপ্তাহেও পুঁজিবাজারে পতন দেখেছেন বিনিয়োগকারীরা। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূল্য সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স দুই দশমিক ৪১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বাজার মূলধনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আলোচিত সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বা এক্সপোজার লিমিট গণনা ও বন্ডে বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিপরীতমুখী অবস্থানের ইস্যুকে ঘিরে বিদায়ী সপ্তাহের আগের সপ্তাহে নেতিবাচক ছিল পুঁজিবাজার। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈঠক ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিএসইসির চেয়ারম্যানের সাক্ষাতের পরে এক্সপোজার লিমিটের ইস্যুটি গুরুত্ব হারাতে থাকে। আশা করা হচ্ছিল এরপরে পুঁজিবাজার ফিরবে ইতিবাচক ধারায়। এমনকি সদ্য বিদায়ী সপ্তাহে আশান্বিত হওয়ার মতো দুটি ঘটনা ছিল। এর একটি হলোÑপুঁজিবাজারে নজরদারি বাড়াতে বিএসইসিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছয় নির্দেশনা, অন্যদিকে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে ডিএসইর পক্ষ থেকে দেশের খ্যাতনামা অর্ধশত কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক।
এছাড়াও সুকুকের মাধ্যমে বেক্সিমকো লিমিটেড তাদের প্রত্যাশিত তিন হাজার কোটি টাকা উত্তোলন শেষ করেছে। এখন সেটি লেনদেন শুরু হওয়ার অপেক্ষায়। সুকুক বন্ডের বেশিরভাগ কিনেছে ব্যাংক। ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা থেকে বন্ড বাইরে না থাকার কারণে তাদের শেয়ার বিক্রি করে এই বিনিয়োগে যেতে হয়েছে। ফলে বিক্রয় চাপ ছিল, যেটি এখন আর নেই। ফলে সদ্য বিদায়ী সপ্তাহে পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকবে এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও সব হিসাব-নিকাশ ছাড়িয়ে সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই পতন হয়েছে ডিএসইতে। সপ্তাহের প্রথম দুই দিনে ১৩০ পয়েন্ট সূচক পতনের পর মঙ্গলবার বেড়েছিল ২০ পয়েন্ট। এরপর আবার দুই দিনই পড়েছে সূচক। বুধবার উত্থানের আলো নিভে গিয়ে সূচকের পতন হয় দুই পয়েন্ট। শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার পড়েছে আরও ৫১ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট। ফলে বিদায়ী সপ্তাহের পাঁচ দিনের লেনদেনে সূচক কমেছে ১৮৩ পয়েন্ট। এর বিপরীতে সূচক বেড়েছে মাত্র ২০ পয়েন্ট।
তবে বাজার পতনের পেছনে কিছু শেয়ারের অতিমূল্যায়িত হয়ে যাওয়ার ফলে সেগুলোর দর সংশোধন, প্রফিট টেকিং ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ঘাটতিকে দূষছেন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা। পুঁজিবাজারের পতনে ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিট খুব বেশি প্রভাব ফেলে না বলে জানিয়েছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, বাজার পতনে এক্সপোজার লিমিট বড় নিয়ামক নয়। বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়েছিল। যাচাই-বাছাই না করেই সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। সেগুলোর দর সংশোধন হচ্ছে। যার কারণে অনেকেই পুঁজি হারিয়েছেন। তারা আর বিনিয়োগে ফেরেননি বা বাড়াননি। এতে করে বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে।
এছাড়া তিনি বলেন, বাজার পতনের আরেকটি কারণ হলো প্রফিট টেকিং। যে মুনাফা করতে পেরেছে সে প্রফিট তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও এর বাইরে নয়। তারা ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর মতোই আচরণ করে। প্রফিট তুলে নেয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমেছে। পুঁজিবাজার স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের টাকাও কিন্তু এখনও পুরোপুরি বিনিয়োগ করা হয়নি। এসব কারণেই দেশের পুঁজিবাজার ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক।
ডিএসইর সাপ্তাহিক লেনদেনের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গেল সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে বাজার মূলধন কমে পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ হিসাবে দুই সপ্তাহে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা মূলধন হারালো।
বাজার মূলধন বাড়া বা কমার অর্থ তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও ইউনিটের দাম সম্মিলিতভাবে ওই পরিমাণ বেড়েছে বা কমেছে। অর্থাৎ বাজার মূলধন বাড়লে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। একইভাবে বাজার মূলধন কমলে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ কমে যায়।
বাজার মূলধন কমার পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইতে যে কয়টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে প্রায় তার চারগুণ প্রতিষ্ঠানের দরপতন হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া ৮১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। এর বিপরীতে দাম কমেছে ২৯৫টির। আর দর ধরে রাখতে পেরেছে পাঁচটি কোম্পানি।
সিংহভাগ কোম্পানির দরপতনের প্রভাবে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১৬৫ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বা দুই দশমিক ৪১ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমে ১১৬ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট বা এক দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ হিসাবে দুই সপ্তাহের পতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ২৮২ পয়েন্ট। এছাড়াও গত দুই সপ্তাহেই পতন হয়েছে অন্য সূচকগুলোর। ইসলামি শরিয়াহ্ ভিত্তিতে পরিচালিত কোম্পানি নিয়ে গঠিত শরিয়াহ্ সূচক ডিএসইএস কমেছে ৩৮ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট বা দুই দশমিক ৬৪ শতাংশ। আর বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ব্ল–-চিপ বা ডিএস৩০ সূচক কমেছে ৭৪ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট বা দুই দশমিক ৮৮ শতাংশ।
এদিকে বিদায়ী সপ্তাহের আগের সপ্তাহে এক কার্যদিবস কম লেনদেন হয়েছে। যার কারণে প্রতিদিনের গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের চেয়ে কমলেও মোট লেনদেন বেড়েছে। সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে ডিএসইতে গড়ে লেনদেন হয়েছে ৭৬২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৯৩৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন কমেছে ১৭০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বা ১৮ দশমিক ২৫ শতাংশ।
তবে বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে তিন হাজার ৮১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে লেনদেন হয় তিন হাজার ৭৩৩ কোটি আট লাখ টাকা। সেই হিসাবে মোট লেনদেন বেড়েছে ৮১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বা দুই দশমিক ১৯ শতাংশ।
এদিকে খাতভিত্তিক লেনদেনের শীর্ষে রয়েছে সাধারণ বিমা খাত। মোট লেনদেনের ১৫ শতাংশ অবদান ছিল এই খাতের। ১৪ দশমিক চার শতাংশ লেনদেন করে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিবিধ খাত। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যাংক খাতের অবদান ছিল ১৩ দশমিক দুই শতাংশ। এছাড়াও ফার্মা খাতের ১০ দশমিক পাঁচ শতাংশ, বস্ত্র খাতের ছয় দশমিক ছয় শতাংশ ও খাদ্য খাতের ছয় শতাংশ, আর্থিক খাতে পাঁচ শতাংশ ও জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের অবদান ছিল পাঁচ শতাংশ। বাকি খাতগুলোর অবদান ছিল পাঁচ শতাংশের নিচে।
আর একক কোম্পানি হিসেবে গত সপ্তাহে ডিএসইতে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বেক্সিমকোর শেয়ার। সপ্তাহজুড়ে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪৪০ কোটি ৫১ লাখ ২৮ হাজার টাকা, যা মোট লেনদেনের ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ওয়ান ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৫৯ কোটি ৬৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। ১১৪ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার টাকা লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফরচুন শুজ। এছাড়া লেনদেনের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছেÑসোনালী পেপার, জিনেক্স ইনফোসিস, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স, আইএফআইসি ব্যাংক ও সাইফ পাওয়ার।