Print Date & Time : 19 April 2026 Sunday 10:23 pm

পুঁজিবাজারে লুটেরাদের তদন্ত চেয়ে দুদকে চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের পুঁজিবাজারে গত ৯০ দশক থেকে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এসব কাজে বিএসইসি, ডিএসই এবং চিহ্নিত মাফিয়া চক্র জড়িত ছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা। এসব চক্রের সদস্যদের পরিচয় এবং বিএসইসি, ডিএসইর কর্মকর্তাদের পরিচয়ও তুলে ধরেছেন তারা। লুটপাটে অংশ নেয়া এসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিনিয়োগকারীদের পক্ষে হেলাল উদ্দিন আকন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দুদকে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে গত নব্বই দশক থেকে চলতি বছর পর্যন্ত যেসব মাফিয়া পুঁজিবাজারকে কুক্ষিগত করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করছি। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে ব্যবহার করে হাজার-হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিশ্বস্ত কিছু মাফিয়া চক্র এবং সরকারি সংস্থা। যারা বিএসইসি ও ডিএসইকে ব্যবহার করে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করে, আইনের তকমা লাগিয়ে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। ফলে বিএসইসি ও ডিএসই বিনিয়োগকারীদের আস্থার স্থান না হয়ে উল্টো অবৈধ কমিশন বাণিজ্য এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বিএসইসি ও ডিএসইর কর্মকর্তারা সরাসরি বাজারের মাফিয়া এবং জুয়াড়িদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। বাজারের দুর্বল, বন্ধ কোম্পানিগুলোকে এনে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উচ্চমূল্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীকে শেয়ার গছিয়ে দিয়েছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যা বর্তমানেও চলমান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা লুটেরা চক্রের কিছু সদস্যের নামও চিঠিতে তুলে ধরেছেন। এদের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানকে চক্রের মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বে লিজিং সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, রেইজ মিচুয়াল ফান্ডের নাফিজ শারাফাত, ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান রাজা, সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান, সোনালী পেপারের চেয়ারম্যান মো. ইউনুস, ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়েদুল করিম, বিকন ফার্মার চেয়ারম্যান এবাদুল করিম, এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শেখ কবির, রেইজ মিচুয়াল ফান্ডের হাসান ইমাম, ইউনাইটেড সিকিরিটিজের পরিচালক রাজিব আল মামুন, সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাদেক হোসেন, ইস্টার্ন ব্যাংক সিকিরিটিজের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুর রহমান, সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র এক্সকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়ারেস উল মতিন, সাউথইস্ট ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাশেদুল ইসলাম, সাউথইস্ট ব্যাংকের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসমিন সুলতানা লাকী, সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটালের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট রাজীব আহমেদ, সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটালের এমডি মো. আবু বকর , শাকিল রিজভী স্টকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল রিজভী, এস এস স্টিলের চেয়ারম্যান জাভেদ অপেনহেগেন, ডিএসইর সাবেক পরিচালক আহমেদ রশিদ লালী, লংকা বাংলা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী, শেলটেক ব্রোকারেজের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কুতুবুদ্দিন আহমেদ, শেলটেক ব্রোকারেজের পরিচালক মইন উদ্দিন এবং সমবায় মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের হিরুকে মাফিয়া চক্রের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটালের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়।
লুটেরা চক্রকে খোদ বিএসইসির কর্মকর্তারা সহায়তা করতেন বলেও চিঠিতে জানানো হয়। যাদের মাধ্যমে চক্রটি দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কারসাজি করে উচ্চমূল্যে লেনদেন করত। এতে পুঁজি হারাত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। চক্রটিকে সহায়তা করার অভিযোগ বিএসইসির সাবেক দুই চেয়ারম্যানসহ সাবেক কমিশনার ও বর্তমান কমিশনার এবং নির্বাহী পরিচালকদের বিরুদ্ধে।

বিএসইসির পাশাপাশি ডিএসইর সাত কর্মকর্তাও লুটপাটে অংশ নিয়েছিলেন বলে চিঠিতে বলা হয়। এই কর্মকর্তারা হলেন- ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, চিফ রেগুলারিটি অফিসার খায়রুল বাশার আবু তাহের, মনিটরিং বিভাগের ম্যানেজার ইকরাম হোসেন, অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার বজলুর রহমান, সিনিয়র এক্সকিউটিভ জাকির হোসেন, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক এবং ম্যানেজার ফাহমিদা খাতুন। বিনিয়োাগকারীরা চিঠিতে জানায়, বিগত সরকারের প্রভাব খাটিয়ে এবং বিএসইসি-ডিএসই কর্মকর্তাদের সহায়তায় এ লুটেরা চক্র শেয়ারবাজারে ১৩০টি দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত করেছে। আবার এসব কোম্পানির শেয়ার অভিনব কারসাজির মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়া ব্রোকারেজ হাউস থেকে এ চক্র সাপ্তাহিক চাঁদা উত্তোলন করত বলে জানানো হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করে হেনস্তা করা হতো। পাশাপাশি কারসাজিতে শেয়ারদর বৃদ্ধিতে এ চক্র ছিল বেশ সক্রিয়। নিজেদের চাওয়া চাহিদামতো তারা নির্দিষ্ট কোম্পানির দাম বাড়ানোর ইন্ধন দিত। শেয়ারবাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলা এ চক্র ও বিএসইসি-ডিএসই কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করে চিঠিতে তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের তদন্ত অনুসন্ধানের আবেদন জানানো হয়।