Print Date & Time : 30 August 2025 Saturday 1:54 pm

পুনঃতফসিলকৃত ঋণই খেলাপি হচ্ছে বেশি

রোহান রাজিব: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের ওপরে ছাড়িয়ে গেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। কী কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, তা জানতে চেয়েছে সংস্থাটি। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয় পুনঃতফসিলকৃত ঋণগুলো আবার খেলাপি হচ্ছে। তাই খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে।

পুনঃতফসিলকৃত ঋণ কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ হয়েছেÑতাও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানতে চায় সংস্থাটি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তথ্য নেই বলে সংস্থাটিকে জানানো হয়। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য পাঠানোর জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে বলে সংস্থাটিকে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত বুধবার আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, খেলাপিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা আইএমএফকে জানানো হয়। পদক্ষেপের অংশ হিসাবে খেলাপির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকে সুশাসন ফেরাতে ইতোমধ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের কথা জানানো হয়েছে। তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে বলেও জানানো হয়। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নিয়েও কাজ করা হচ্ছে বলে অবহিত করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। জুন শেষে সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ০১ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকের ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকের ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ।

জানা যায়, খেলাপি ঋণ কম দেখাতে পুনঃতফসিলের পথে হাঁটছে ব্যাংকগুলো। তবুও খেলাপি ঋণ কমছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃতফসিল করার ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পর পুনঃতফসিল ঋণ অস্বাভাবিক বেড়েছে। নীতি ছাড়ের এ সুযোগে ২০২২ সালেই ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইএমএফ। আইএমএফের মিশন প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ কর্মসূচির আওতায় সরকারের অগ্রগতি এবং দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে আইএমএফের প্রতিনিধিদল জানতে চায়- বিশ্বের অনেক দেশ মূল্যস্ফীতির মাত্রা কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে কেন উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ডলারের দর ঊর্ধ্বমুখী। আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উচ্চ মূল্য। তাই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

যদিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চলতি বছরের জুলাইয়ে সরকার বাজারভিত্তিক সুদের হার চালু করে এবং পলিসি রেট বাড়িয়েছিল। তবে তা বাড়িয়ে কাক্সিক্ষত ফল পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যায়।

বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে উঠেছিল, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর জুন ও জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে। তা জুন মাসে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও জুলাইয়ে ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়। তবে আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে যায়। এ মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর গত মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে।

তাই আগামী ডিসেম্বরে মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নীতি সুদহার বা রেপো রেট একবারে দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে নতুন নীতি সুদহার বা রেপো রেট দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ; যা আগে ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তাও আবার আইএমএফ মিশনের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর এ সিদ্ধান্ত আসে। এ সিদ্ধান্তের একদিন পর গত বৃহস্পতিবার আবার ব্যাংক ঋণের সুদহারও বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঋণের সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্মার্টের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশের স্থলে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ শতাংশ মার্জিন যোগ করে সুদহার নির্ধারণ করতে হবে। প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণ এবং কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্মার্টের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২ শতাংশের স্থলে সর্বোচ্চ আড়াই শতাংশ মার্জিন যোগ করে সুদহার নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে নতুন ঋণে সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণ এবং কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদহার হবে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। যারা আগে ঋণ নিয়েছেন, তাদের সুদহার ছয়? মাসের মধ্যে পরিবর্তন করা যাবে না। ছয় মাস শেষ হলেই তাদের ক্ষেত্রে নতুন সুদ কার্যকর হবে।

সূত্র জানায়, আইএমএফ বাংলাদেশকে দেয়া ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের অন্যতম শর্ত ছিল চলতি বছরের জুনে নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (এনআইআর) ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং সেপ্টেম্বরে তা ২৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে রাখা। তবে এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া রাজস্ব আহরণের শর্তও পূরণ হয়নি। গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের একাধিক বৈঠক হয়। বৈঠকে কী কারণে এ দুটি শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়নি, তার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক সাংবাদিকদের বলেন, আইএমএফ ঋণ অনুমোদনের সময় আমাদের কিছু শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করা হয়েছে। এগুলো হলোÑবিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ হিসাবায়ন করা হচ্ছে। মুদ্রার বাজার-নির্ধারিত বিনিময় হার প্রবর্তন করা হয়েছে। সুদহারের নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। তবে দুটি বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এগুলো হলোÑনির্ধারিত রিজার্ভ সংরক্ষণ ও রাজস্ব আহরণের শর্ত। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে মিশনকে অবহিত করা হয়।

উল্লেখ্য, ঋণ কর্মসূচির পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা ও সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য কর্মসূচির প্রথম পর্যালোচনা শুরু করতে এরই মধ্যে ঢাকায় এসেছে আইএমএফের প্রতিনিধিদল। মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইএমএফের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ। ঢাকায় অবস্থানকালে আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত তারা সরকারের একডজনের বেশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন।