বেলায়েত সুমন, চাঁদপুর: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন অতি দরিদ্রদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পে অভিনব কৌশলে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে চাঁদপুর জেলার আট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কিছু জনপ্রতিনিধিসহ প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। ফলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতাভুক্ত স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসন ও দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের সফল বাস্তবায়ন ভেস্তে যেতে বসেছে। এতে জেলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়ন কাগজে-কলমে শতভাগ দেখা গেলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র।
সূত্রমতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘অতিদরিদ্রদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান’ কর্মসূচির ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দকৃত এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকা থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নন-ওয়েজ কস্ট বাবদ ৩৫ কোটি ১১ লাখ ১৪ হাজার ৯৭২ টাকা মঞ্জুরি প্রদান করা হয়। এসব অর্থ থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম বিভাগের আট জেলার ৬৫ উপজেলার ইজিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের নিমিত্তে নন-ওয়েজ কস্ট ব্যয় নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুকূলে পাঁচ কোটি ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে চাঁদপুর জেলার ৮৯ ইউনিয়নে ১০ হাজার ৬০৫ জন উপকারভোগীর জন্য সর্বমোট ৭৭ লাখ ৯০ হাজার ৬৭ টাকা ব্যয় নির্বাহের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়েও অনুরূপ বরাদ্দ হয় জেলার ৮৯টি উপজেলায়।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৭নং পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ‘কামালপুর পাকা রাস্তা থেকে পশ্চিমমুখী সাহাবাড়ী পর্যন্ত সংস্কার’ কাজ দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হয়। প্রকল্পে রাস্তার কাজ শেষ করে উপকারভোগীর টাকা উত্তোলনের নিয়ম থাকলেও কাজ শেষ হওয়ার আগেই ২৭ শ্রমিকের ৪০ দিনের কাজের মজুরির চার লাখ ৩২ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য শাহ আলমসহ ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামীম ও ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আকরামের বিরুদ্ধে।
সূত্রমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরের ইজিপিপি প্রকল্পের প্রভার্টি ইনডেক্স অনুযায়ী, সি ক্যাটেগরিতে থাকা পাইকপাড়া ইউনিয়নে দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ২০ ভাগ উল্লেখ থাকলেও রহস্যজনক কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৬নং ওয়ার্ডের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ। এ ওয়ার্ডেই চার লাখ ৩২ হাজার টাকার প্রকল্প থেকে কোনো সুবিধা পাননি নি¤œ আয়ের দরিদ্র মানুষ।
এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকা কামালপুরের পাকা রাস্তা থেকে প্রায় ২০০ মিটার রাস্তার সংস্কার না হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে স্থানীয়দের। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের সভাপতি ৬নং ওয়ার্ড থেকে ২৭ উপকারভোগীর তালিকা দেয়ার কথা থাকলেও ওয়ার্ডভিত্তিক চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যায়, ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে ৫০ জন, ২নং ওয়ার্ডে ২৩ জন, ৩নং ওয়ার্ডে ২৬ জন, ৪নং ওয়ার্ডে ১২ জন, ৭নং ওয়ার্ডে ৪৫ জন, ৮নং ওয়ার্ডে ৫০ জনসহ ছয়টি ইউনিয়নে মোট ২৯৫ জন উপকারভোগীর নাম রয়েছে। কিন্তু ৬নং ওয়ার্ডের উপকারভোগীদের কোনো তালিকা নেই।
কামালপুর রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উপকারভোগীর তালিকা দিয়েছেন ১৪ জনের, ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আকরাম উপকারভোগীর তালিকা দিয়েছেন চারজনের, ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার উপকারভোগীর তালিকা দিয়েছেন তিনজনের। ২৭ জনের মধ্যে বাকি ছয়জন উপকারভোগীর তালিকার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পে বরাদ্দকৃত টাকা পরিশোধে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে দাখিলকৃত উপকারভোগীদের মোবাইল নম্বর-সংবলিত তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। ফলে উপকারভোগীদের মোবাইলে টাকা আসার পর প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই টালবাহানা শুরু করে। এসব কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া কাজ করেও টাকা পাননিÑএমন অভিযোগও তুলেছেন ভুক্তভোগী অনেকেই।
ফরিদগঞ্জের পিআইও মিল্টন দস্তিদারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলেও কয়েকবার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে হাজীগঞ্জ উপজেলার ৮নং হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নে আঞ্জুম আরা নামে এক উপকারভোগীর আইডি ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে। যদিও ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম জানান, মোবাইল নম্বর ভুল হওয়ায় উপকারভোগীর মোবাইলটি আমার কাছে রেখেছি।
মতলব উত্তর উপজেলার এখলাসপুর ইউনিয়নের রাবিয়া খাতুন নামে আরেক উপকারভোগী বলেন, রাস্তায় কাজ করেও আমি টাকা পাইনি। আমার মোবাইল নম্বর ভুল হয়েছে বলে আমার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে পরে ফেরত দেন স্থানীয় ইউপি সদস্য।
এদিকে শাহরাস্তি উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সবুজ মিয়ার বিরুদ্ধেও প্রকল্পের নিয়মনীতি না মেনে সাইনবোর্ড তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, শক্ত কাঠ ও স্টিলের ফ্রেমযুক্ত সিআইজি সিট দিয়ে সাইনবোর্ড তৈরির কথা থাকলেও পিআইও’র যোগসাজশে স্থানীয় এক ডিজিটাল প্রিন্ট ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ২৪০ জিএসএম পিভিসি মিডিয়ায় কাঠের ফ্রেমযুক্ত সাইনবোর্ড তৈরির সত্যতা পাওয়া যায়। প্রতিটি সাইনবোর্ড এর নির্মাণব্যয় ব্যবদ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা খরচ হলেও ৩০টি সাইনবোর্ড তৈরিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় দেখিয়ে বিল ভাউচার তৈরি করা হয়।
এরআগেও ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পের সভাপতির যোগসাজশে প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে অর্থ আত্মসাতের অসংখ্য অভিযোগ ওঠে পিআইও সবুজ মিয়ার বিরুদ্ধে। এত অভিযোগের পরও তিনি আছেন বহাল তবিয়তে!
পিআইও সবুজ মিয়া এসব অনিয়মের সত্যতা অস্বীকার করে বলেন, সব ইউএওনও জানেন, তার সঙ্গে কথা বলেন। ইউএওন বদলি হয়ে অন্যত্র যাওয়ায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।
