প্রতিষ্ঠানের অনৈতিক কৌশল ও কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ

নূরে এ. খান:

ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা এবং কর্মপদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান এমন কৌশল অবলম্বন করে, যা নৈতিকতার বাইরে গিয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন অসদাচরণ ও অনৈতিক নীতিকে গ্রহণ করে। বিশেষ করে, যখন কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নেন, তখন কিছু প্রতিষ্ঠান তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা বিদায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করা, কর্মরত কর্মকর্তাদের তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা, এমনকি তার অবদান ও ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করাও প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে যারা কর্মরত থাকে, তাদের উচিত বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করা যে, ভবিষ্যতে তারাও একই পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা মানে নিজেদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তোলা। এ লেখায় আমরা বিশদভাবে আলোচনা করব কীভাবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়, এর নেতিবাচক প্রভাব, কর্মচারীদের করণীয় এবং একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরির সম্ভাব্য সমাধান।

প্রতিষ্ঠানের অনৈতিক কার্যকলাপ: একটি বাস্তব চিত্র

কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন অনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে। এই কৌশলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—১. বিদায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো: যখন কোনো কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন, তখন অনেক প্রতিষ্ঠান তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের গুজব ছড়ায়, যাতে তার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এটি সাধারণত করা হয় বিদায়ী কর্মকর্তার প্রতি বর্তমান কর্মচারীদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে এবং প্রতিষ্ঠান যেন তাকে ভুলে যায়; ২. নতুন কর্মীদের দিয়ে আগের কর্মকর্তার ভূমিকা অস্বীকার করানো: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদায়ী কর্মকর্তার অবদান মুছে ফেলতে নতুন কর্মীদের বলা হয়, পূর্ববর্তী কর্মকর্তার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল না। এতে নতুন কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয় এবং তারা প্রতিষ্ঠানকে সবসময় ন্যায়পরায়ণ মনে করে; ৩. কাচের দেয়াল তৈরি করা: প্রতিষ্ঠান সচেতনভাবে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করে যাতে করে বিদায়ী ব্যক্তি আর কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে না পারে। তাকে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে না দেওয়া, তার সঙ্গে পূর্বপরিচিতদের সম্পর্ক ছিন্ন করানো এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করাও এর মধ্যে পড়ে; ৪. বর্তমান কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানমুখী করা: বিদায়ী কর্মকর্তাকে ভুলে যেতে প্রতিষ্ঠান তার কর্মচারীদের মধ্যে এমন মানসিকতা তৈরি করে, যেন তারা কেবল প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের কথা ভাবে। এতে কর্মচারীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অন্ধ থেকে যায় এবং অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত হয়।

এ ধরনের প্রবণতা কেন বিপজ্জনক: যেসব কর্মচারী এ ধরনের প্রবণতাকে স্বাভাবিক মনে করে, তারা নিজেদের অজান্তেই ভবিষ্যতে নিজের বিপদ ডেকে আনছে। নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—

১. একদিন তারাও একই পরিস্থিতির শিকার হতে পারে: যে কর্মচারীরা আজ বিদায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তারা ভুলে যায় ভবিষ্যতে তারাও প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নেবে। তখন তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ষড়যন্ত্র হতে পারে; ২. মানসিক বিকৃতি সৃষ্টি হয়: যখন কোনো ব্যক্তি অনৈতিক কাজকে সমর্থন করে, তখন তার নৈতিকতা দিন দিন নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সে মেধাহীন ও সৃজনশীলতাহীন হয়ে পড়ে, যা তার ক্যারিয়ারে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে; ৩. পেশাগত সম্মান হারিয়ে যায়: যেসব কর্মচারী অন্ধভাবে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার নামে অন্যের ক্ষতি করে, তারা নিজের পেশাগত গুণাবলি হারিয়ে ফেলে এবং ভবিষ্যতে ভালো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়; ৪. শ্রমবাজারে খারাপ সুনাম তৈরি হয়: যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অনৈতিক নীতি গ্রহণ করে, ধীরে ধীরে শ্রমবাজারে তাদের সুনাম নষ্ট হয়। ফলে মেধাবী কর্মীরা সেখানে যোগ দিতে চায় না এবং প্রতিষ্ঠান তার প্রকৃত উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়।

কর্মচারীদের করণীয়: যেসব কর্মচারী এখনো কর্মরত আছেন, তাদের উচিত বিষয়টি উপলব্ধি করা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। তারা নিম্নলিখিত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন—

১. নৈতিক মান বজায় রাখা: কর্মচারীদের উচিত প্রতিষ্ঠানের কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ না নেয়া এবং নিজেদের ব্যক্তিগত সততা অক্ষুণ্ন রাখা; ২. অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা: যদি প্রতিষ্ঠান কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে ষড়যন্ত্র করে, তবে কর্মচারীদের উচিত তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কারণ আজ যে অন্যায় হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে তার সঙ্গেও হতে পারে; ৩. ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া: কর্মচারীদের উচিত নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি করা, যাতে ভবিষ্যতে ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। যোগ্যতা যখন আপনার, তখন কেউ আপনাকে ব্র্যাকেটবন্দি করতে পারবে না, এ উপলব্ধি মাথায় রাখা; ৪. সুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া: কর্মচারীদের উচিত প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন তোলা এবং সুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখা। মনে রাখা জরুরি একটি সুস্থ কর্ম পরিচালনা তখনই স্থায়ী হবে যখন আপনার কর্মপরিবেশটি একটি সুস্থ ও মানবিক পরিবেশ বজায় রাখবে।

যেসব প্রতিষ্ঠান বিদায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং কর্মরত কর্মচারীদের এতে জড়িত করে, তারা মূলত নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যারা আজ এই কাজে সমর্থন দিচ্ছে, তারা একদিন নিজেরাই শিকার হবে। তাই কর্মচারীদের উচিত প্রতিষ্ঠানের এই অমানবিক কৌশলগুলো বুঝে নেয়া এবং নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের পেশাদারিত্ব রক্ষা করা।

একটি সুস্থ ও টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে ন্যায়ের পক্ষে থাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা জরুরি। একজন সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মচারী হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সুস্থ কর্মসংস্কৃতি বজায় রাখা, যেখানে প্রত্যেক কর্মী তার সঠিক মর্যাদা পাবে এবং প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘস্থায়ীভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে।

অনেক কর্মচারী বা কর্মকর্তাই হয়তো স্বল্প সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিপূর্ণ বা অনৈতিক নীতিতে অংশগ্রহণ করেন, হয়তো চাকরি বাঁচাতে বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য। কিন্তু তারা এটা বোঝেন না, এই সংস্কৃতি একদিন তাদের দিকেও ফিরে আসবে। যে প্রতিষ্ঠান আজ একজনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে, কাল সেই একই প্রতিষ্ঠান অন্য কারও বিরুদ্ধেও একই কাজ করবে।

একটি প্রতিষ্ঠান যদি অসততা, প্রতারণা, বা অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে নিজের সুনাম হারায় এবং কর্মক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এবং নৈতিকতার দিক থেকে বিচার করলে অন্যায়ভাবে কারও ক্ষতি করা, অন্যায়ভাবে কাউকে অপবাদ দেওয়া, বা অসততার সঙ্গে কাজ করা সবই হারাম উপার্জনের অংশ। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অনৈতিক কাজ করে এবং কারও ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে সে শুধু প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং নিজের জীবিকাও হারামের মধ্যে ফেলছে।

একজন মানুষ কেবল তখনই প্রকৃত অর্থে একজন বুদ্ধিমান প্রাণী বা বিবেকবান ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারে, যখন সে সততার সঙ্গে কাজ করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সততা ও নৈতিকতা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়, এটি কর্মক্ষেত্রে সফলতার অন্যতম শর্ত।

সিইও, চার্ম