বেলায়েত সুমন, চাঁদপুর: চাঁদপুরের অধিকাংশ ইটভাটায় এরই মধ্যে ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে স্তূপ করে রেখেছেন ইটভাটা মালিকরা। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই এসব ইটভাটায় চলছে ইট তৈরির প্রস্তুতি। এতে পরিবেশ দূষণসহ ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করেই বছরের পর বছর ধরে চালু রয়েছে এসব ইটভাটা। প্রশাসন কর্তৃক ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা শেষে জরিমানা করার পর ইটভাটা বন্ধ করতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় এসব ইটভাটা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতি বছরই ফসলি জমির টপ সয়েল কাটার মহোৎসব চললেও সংশ্লিষ্টরা নামমাত্র অভিযান পরিচালনা শেষেই নির্বিকার থাকার অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রমতে, জেলার আট উপজেলায় ১২৫টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুর সদরে আটটি, হাইমচরে দুটি, হাজীগঞ্জে পাঁচটি, শাহরাস্তিতে ১১টি, ফরিদগঞ্জে ১৬টি, কচুয়ায় চারটি, মতলব দক্ষিণে চারটি ও মতলব উত্তরে চারটি ইটভাটা লাইসেন্সবিহীন অবৈধভাবে চালু রাখার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ইটভাটা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলে আসছে। এছাড়া হালনাগাদ ছাড়পত্র রয়েছে ৪০টি ইটভাটার। বন্ধ রয়েছে ২৫টি। বাকি ইটভাটাগুলোর মালিকরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে ইট তৈরি অব্যাহত রেখেছেন। তবে এর মধ্যে ১০-১৫টি ইটভাটার ছাড়পত্র নেয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নভেম্বর মাসে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধের ব্যবস্থা করতে দেশের প্রতিটি জেলার প্রশাসকদের সাত দিনের মধ্যে কার্যকর নির্দেশনা দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পরিবেশ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে অগ্রগতি জানিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতেও বলা হয়েছিল তখন। এক রিটের প্রাথমিক শুনানিতে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।
তবে হাইকোর্টের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে চাঁদপুরে ৫৪টি ইটভাটায় অবৈধভাবে ইট তৈরির প্রস্তুতি চলছে বলে অভিযোগ ওঠে, যেগুলোর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। ফলে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। ইটভাটাগুলোয় দেদার কাঠ, টায়ার ও মাত্রাতিরিক্ত সালফারযুক্ত পাথুরে কয়লা ব্যবহারের ফলে পরিবেশও রয়েছে হুমকির মুখে। এমনকি এসব অবৈধ ইটভাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ ও ফসলি জমি। অথচ ইটভাটার কারণে ফসলি জমি যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন ( নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হইতে মাটি কাটিয়া বা সংগ্রহ করিয়া ইটের কাঁচামাল হিসাবে উহা ব্যবহার করিতে পারিবেন না।’ বিধিবিধান থাকলেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এসব অবৈধ ইটভাটার বেশিরভাগই ১২০ ফুট উচ্চতার চিমনিবিশিষ্ট সনাতন ইটভাটা। এছাড়া কিছু ইটভাটায় মাত্রাতিরিক্ত সালফারযুক্ত পাথুরে কয়লা ব্যবহƒত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমদানি করা এসব কয়লা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কয়লা ব্যবহারের ফলে ইটভাটা-সংলগ্ন এলাকাগুলোয় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগেও আক্রান্ত হয়ে শত শত মানুষ ভুগছে।
আবার কিছু ইটভাটা রয়েছে নিষিদ্ধ এলাকায়, যেমন পৌরসভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কিংবা রেলাইনের পাশে। এসব ভাটা পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে কাঠ, টায়ার, পোশাক কারখানার বর্জ্য ও ভুসি জ্বালানোর ফলে তা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত করছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি ইটভাটার ধোঁয়ায় জমির ফসল ও ফলদ গাছে ফল ধরাও প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে।
অপরদিকে ইটভাটার অধিকাংশ মালিক দাবি করেন, তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছেন। বিভিন্ন আইনি জটিলতায় ছাড়পত্র পেতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে ইট তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন উপজেলাসহ জেলার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি চলছে ঢিলেঢালা গতিতে। এমনকি জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। গত সপ্তাহে শাহরাস্তি উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও আবার সেখানে ইট তৈরির অভিযোগ রয়েছে। ওই ভাটাগুলোর মালিক প্রশাসনের কতিপয় কর্তাব্যক্তিকে ম্যানেজ করে আবার ইটভাটা চালু করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হান্নান বলেন, লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা পরিচালনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। চাঁদপুর জেলায় ১২৫টি ইটভাটার মধ্যে ৫৪টির মতো লাইসেন্সবিহীন রয়েছে। আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। শিগগিরই ভাটাগুলোয় অভিযান পরিচালনা করা হবে।




